 |
| বিএসইসি ভবনে আধুনিক ও বিনিয়োগবান্ধব শেয়ারবাজার বিনির্মাণে অনুষ্ঠিত বিশেষ সমন্বয় সভা। |
আধুনিক ও বিনিয়োগবান্ধব শেয়ারবাজার গড়তে বিএসইসি’র মহাপরিকল্পনা: সংস্কারের নতুন যুগে বাংলাদেশ
নিজস্ব প্রতিবেদক | ঢাকা
আধুনিক ও বিনিয়োগবান্ধব শেয়ারবাজার গড়ে তোলা এখন সময়ের দাবি। দেশের অর্থনীতির অন্যতম প্রধান স্তম্ভ পুঁজিবাজারকে শক্তিশালী, স্বচ্ছ এবং গতিশীল করার লক্ষ্যে এক বিশাল কর্মযজ্ঞ শুরু করেছে বাংলাদেশ সিকিউরিটিজ অ্যান্ড এক্সচেঞ্জ কমিশন (বিএসইসি)। দীর্ঘদিনের আস্থার সংকট দূর করে সাধারণ বিনিয়োগকারীদের ফিরিয়ে আনতে এবং বাজারের আইনি ও প্রযুক্তিগত কাঠামো আমূল বদলে দিতে সরকার ও নিয়ন্ত্রক সংস্থা এখন একযোগে কাজ করছে। এরই ধারাবাহিকতায় গত ১৮ জানুয়ারি, ২০২৫ তারিখে রাজধানীর আগারগাঁওয়ে বিএসইসি’র মাল্টিপারপাস হলে অনুষ্ঠিত হয়েছে এক গুরুত্বপূর্ণ সমন্বয় সভা।
বিএসইসি এবং বাজার সংশ্লিষ্ট অংশীজনদের অংশগ্রহণে অনুষ্ঠিত এই ৫ম মাসিক সমন্বয় সভায় দেশের আধুনিক ও বিনিয়োগবান্ধব শেয়ারবাজার গড়ার পথে বিদ্যমান প্রতিবন্ধকতা এবং সেগুলো উত্তরণের উপায় নিয়ে বিস্তারিত আলোচনা করা হয়। সভায় বর্তমান বাজার পরিস্থিতি পর্যালোচনার পাশাপাশি দীর্ঘমেয়াদি উন্নয়নের রোডম্যাপ তৈরি করা হয়েছে।
আধুনিক ও বিনিয়োগবান্ধব শেয়ারবাজার প্রতিষ্ঠায় বিএসইসি ও অংশীজনদের সমন্বয় সভা
সভার মূল আলোচনায় গুরুত্ব পায় বাজারের স্বচ্ছতা ও জবাবদিহিতা। অর্থ মন্ত্রণালয়ের আর্থিক প্রতিষ্ঠান বিভাগ কর্তৃক গঠিত কমিটির সভাপতি এবং মাননীয় প্রধান উপদেষ্টার বিশেষ সহকারী ড. আনিসুজ্জামান চৌধুরী সভায় প্রধান বক্তা হিসেবে তার সুচিন্তিত মতামত তুলে ধরেন। তিনি বলেন, একটি আধুনিক ও বিনিয়োগবান্ধব শেয়ারবাজার গঠন করতে হলে বাজারের চিহ্নিত সমস্যাগুলো সমাধানে সব পক্ষকে ঐক্যবদ্ধ হতে হবে।
ড. আনিসুজ্জামান চৌধুরী তার বক্তব্যে উল্লেখ করেন যে, সংস্কারের মাধ্যমে বাজারের গভীরতা বাড়ানোই এখন প্রধান লক্ষ্য। তিনি এই নিয়মিত সমন্বয় সভাকে একটি কার্যকর প্লাটফর্ম হিসেবে অভিহিত করে বলেন, অংশীজনদের গঠনমূলক মতামত ও সহযোগিতার ভিত্তিতে সর্বসম্মত সিদ্ধান্ত গ্রহণ করা গেলে বাজারের প্রকৃত উন্নয়ন সম্ভব হবে। বিদায়ী ২০২৪-২৫ বছরে সংস্কার কাজে সবার স্বতঃস্ফূর্ত অংশগ্রহণের প্রশংসা করে তিনি দ্রুততম সময়ে বিদ্যমান আইনি জটিলতা সমাধান করে একটি আধুনিক ও বিনিয়োগবান্ধব শেয়ারবাজার নিশ্চিত করার নির্দেশনা দেন।
নতুন নীতিমালা: আধুনিক ও বিনিয়োগবান্ধব শেয়ারবাজার গঠনের আইনি ভিত্তি
বিএসইসি’র চেয়ারম্যান খন্দকার রাশেদ মাকসুদ সভার সভাপতিত্ব করেন এবং কমিশনের পক্ষ থেকে গৃহীত বিভিন্ন বৈপ্লবিক পদক্ষেপের চিত্র তুলে ধরেন। তিনি অত্যন্ত দৃঢ়তার সাথে জানান যে, শেয়ারবাজারের আইনি ভিত্তিকে শক্তিশালী করতে ইতিমধ্যে তিনটি অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ নীতিমালা প্রণয়নের কাজ ২০২৫ সালের মধ্যেই সফলভাবে সম্পন্ন করা হয়েছে। এগুলো হলো:
১. বাংলাদেশ সিকিউরিটিজ অ্যান্ড এক্সচেঞ্জ (মার্জিন) বিধিমালা, ২০২৫
২. মিউচুয়াল ফান্ড বিধিমালা, ২০২৫
৩. পাবলিক অফার অব ইক্যুইটি সিকিউরিটিজ রুলস, ২০২৫
চেয়ারম্যান তার বক্তব্যে আইপিও-কে শেয়ারবাজারের ‘হৃৎপিণ্ড’ হিসেবে অভিহিত করেন। তিনি বিশ্বাস করেন, এই নতুন রুলসের মাধ্যমে বাজারে ভালো মানের ও মৌলভিত্তি সম্পন্ন শেয়ার আসার পথ এখন পুরোপুরি উন্মুক্ত। একটি আধুনিক ও বিনিয়োগবান্ধব শেয়ারবাজার গড়ে তুলতে হলে আইনি কাঠামোর সঠিক প্রয়োগ এবং ভালো কোম্পানি তালিকাভুক্তি অপরিহার্য। তিনি বাজার সংশ্লিষ্ট সকল প্রতিষ্ঠানকে এই শক্তিশালী আইনি কাঠামোর সঠিক ব্যবহারের মাধ্যমে বাজারের গভীরতা বাড়ানোর আহ্বান জানান। একইসঙ্গে তিনি বাজার সংস্কারে প্রধান উপদেষ্টা ও অর্থ উপদেষ্টার নিরবচ্ছিন্ন সহযোগিতার কথা কৃতজ্ঞচিত্তে স্মরণ করেন।
প্রযুক্তির ছোঁয়ায় আধুনিক ও বিনিয়োগবান্ধব শেয়ারবাজার ও ডিজিটাল রূপান্তর
সভার অন্যতম আলোচনার বিষয় ছিল শেয়ারবাজারের কারিগরি ও কৌশলগত আধুনিকায়ন। প্রযুক্তির সঠিক ব্যবহার ছাড়া একটি আধুনিক ও বিনিয়োগবান্ধব শেয়ারবাজার কল্পনা করা অসম্ভব। এ লক্ষ্যে বিএসইসি একটি ৫ বছর মেয়াদি মহাপরিকল্পনা গ্রহণ করেছে। এই পরিকল্পনার আওতায় বাজারে নতুন নতুন পণ্য বা ইনস্ট্রুমেন্ট প্রবর্তন করা হবে যাতে বিনিয়োগের ক্ষেত্রে বৈচিত্র্য আসে।
সভায় প্রযুক্তির মাধ্যমে ই-কেওয়াইসি (e-KYC) প্রক্রিয়া সহজীকরণ এবং দ্রুততম সময়ে অনলাইনে বিও অ্যাকাউন্ট খোলার বিষয়টি নিয়ে আলোচনা হয়। বাজার সংশ্লিষ্ট সকল প্রতিষ্ঠানের মধ্যে এপিআই (API) কানেকটিভিটি বৃদ্ধির বিষয়ে সভায় সকল প্রতিনিধি একমত পোষণ করেন। এটি নিশ্চিত করা গেলে বিনিয়োগকারীরা আরও স্বচ্ছতার সাথে লেনদেন করতে পারবেন। এছাড়া বহুল প্রতীক্ষিত ‘কমোডিটি এক্সচেঞ্জ’ দ্রুত চালু করা এবং ‘সেন্ট্রাল কাউন্টারপার্টি বাংলাদেশ লিমিটেড’ (সিসিবিএল)-এর অপারেশনাল কার্যক্রম শুরু করাও একটি আধুনিক ও বিনিয়োগবান্ধব শেয়ারবাজার গড়ার অন্যতম শর্ত হিসেবে দেখা হচ্ছে।
বাজারের গভীরতা বৃদ্ধি ও বহুজাতিক কোম্পানির তালিকাভুক্তি
শেয়ারবাজারের স্থিতিশীলতা রক্ষায় বাজারে পর্যাপ্ত ভালো শেয়ার থাকা জরুরি। সভায় রাষ্ট্রীয় মালিকানাধীন লাভজনক কোম্পানি এবং বাংলাদেশে ব্যবসা করা স্বনামধন্য বহুজাতিক কোম্পানিগুলোকে শেয়ারবাজারে তালিকাভুক্ত করার ওপর বিশেষ গুরুত্ব দেওয়া হয়। বক্তারা মনে করেন, বড় বড় কোম্পানিগুলো বাজারে আসলে বিনিয়োগকারীদের আস্থা বাড়বে এবং একটি প্রকৃত আধুনিক ও বিনিয়োগবান্ধব শেয়ারবাজার গড়ে উঠবে।
বিনিয়োগকারীদের সুরক্ষা নিশ্চিত করতে প্রাতিষ্ঠানিক সুশাসন বা করপোরেট গভর্ন্যান্সের ওপর কড়াকড়ি আরোপের সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়েছে। এছাড়া মার্চেন্ট ব্যাংকগুলোর কাজের পরিধি বৃদ্ধি এবং বাজারে তাদের সক্রিয়তা বাড়ানোর প্রস্তাব করা হয়েছে। বিশেষ করে মার্জার ও একুইজিশন প্রক্রিয়াকে আরও গতিশীল করার বিষয়ে সভায় ঐকমত্য প্রকাশ করা হয়, যা দুর্বল কোম্পানিগুলোকে পুনরায় সচল করতে সাহায্য করবে।
বিনিয়োগ শিক্ষা ও তৃণমূল পর্যায়ে সচেতনতা বৃদ্ধি
একটি আধুনিক ও বিনিয়োগবান্ধব শেয়ারবাজার গড়ার জন্য শিক্ষিত বিনিয়োগকারী সমাজ প্রয়োজন। এ লক্ষ্যে জেলা ও উপজেলা প্রশাসনকে সম্পৃক্ত করে নতুন বিনিয়োগ শিক্ষা পরিকল্পনা গ্রহণ করা হয়েছে। দেশব্যাপী সাধারণ মানুষের মধ্যে সচেতনতা সৃষ্টি করতে বাংলাদেশ টেলিভিশনে পাক্ষিক ভিত্তিতে বিনিয়োগ শিক্ষা বিষয়ক বিশেষ অনুষ্ঠান প্রচারের উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে। সাধারণ মানুষ যখন শেয়ারবাজারের খুঁটিনাটি বুঝতে পারবে, তখন তারা গুজবে কান না দিয়ে সঠিক জায়গায় বিনিয়োগ করবে, যা বাজারের জন্য মঙ্গলজনক।
সমন্বয় সভায় উপস্থিত অংশীজনদের মতামত
উক্ত সভায় বিএসইসি’র কমিশনার মুঃ মোহসিন চৌধুরী, মোঃ আলী আকবর, ফারজানা লালারুখ এবং মোঃ সাইফুদ্দিনসহ কমিশনের উর্ধ্বতন কর্মকর্তারা উপস্থিত ছিলেন। তারা সবাই একটি আধুনিক ও বিনিয়োগবান্ধব শেয়ারবাজার বিনির্মাণে নিজ নিজ দপ্তরের কর্মপরিকল্পনা পেশ করেন।
এছাড়াও ঢাকা স্টক এক্সচেঞ্জ (ডিএসই) এর চেয়ারম্যান মমিনুল ইসলাম ও ব্যবস্থাপনা পরিচালক নুজহাত আনোয়ার বাজারে তারল্য সংকট কাটানোর উপায় নিয়ে কথা বলেন। সিসিবিএল চেয়ারম্যান মেজর জেনারেল (অব.) মোঃ ওয়াহিদ-উজ-জামান, ডিবিএ প্রেসিডেন্ট সাইফুল ইসলাম, আইসিবি’র ব্যবস্থাপনা পরিচালক নিরঞ্জন চন্দ্র দেবনাথ এবং সিডিবিএল-এর এমডি মো. আবদুল মোতালেবসহ চট্টগ্রাম স্টক এক্সচেঞ্জ ও বিএমবিএ-এর শীর্ষ প্রতিনিধিবৃন্দ তাদের সুচিন্তিত মতামত প্রদান করেন। সবাই একবাক্যে স্বীকার করেন যে, বর্তমান কমিশনের গৃহীত সংস্কারমূলক পদক্ষেপগুলো বাস্তবায়িত হলে বাংলাদেশের পুঁজিবাজার দক্ষিণ এশিয়ায় অন্যতম শ্রেষ্ঠ আধুনিক ও বিনিয়োগবান্ধব শেয়ারবাজার হিসেবে আত্মপ্রকাশ করবে।
বাজারের টেকসই উন্নয়ন ও আগামীর পথচলা
সভার শেষ পর্যায়ে বিএসইসি চেয়ারম্যান সংশ্লিষ্ট সকলের প্রতি ধন্যবাদ জ্ঞাপন করেন। তিনি আবারও মনে করিয়ে দেন যে, বাজারের শৃঙ্খলা ও স্বচ্ছতা বজায় রাখতে কমিশন শূন্য সহনশীলতা (Zero Tolerance) নীতি অবলম্বন করবে। শেয়ারবাজারকে ম্যানিপুলেশন বা কারসাজিমুক্ত রাখা এবং সাধারণ বিনিয়োগকারীদের আমানত রক্ষা করাই কমিশনের মূল দায়িত্ব।
সবশেষে বলা যায়, ২০২৫ সালের এই নতুন নীতিমালা এবং বিএসইসি’র মহাপরিকল্পনা বাস্তবায়িত হলে দেশের অর্থনীতি এক নতুন উচ্চতায় পৌঁছাবে। আইনি সংস্কার, প্রযুক্তির ব্যবহার এবং ভালো কোম্পানির উপস্থিতি নিশ্চিত করার মাধ্যমে আমরা খুব শীঘ্রই একটি আধুনিক ও বিনিয়োগবান্ধব শেয়ারবাজার দেখতে পাব। এই সমন্বিত উদ্যোগগুলো যদি ধারাবাহিকভাবে বজায় থাকে, তবে পুঁজিবাজার হবে দীর্ঘমেয়াদি বিনিয়োগের সবচেয়ে নিরাপদ ও লাভজনক স্থান।
Comments
Post a Comment