 |
| বরিশালে বাড়ছে বিবাহবিচ্ছেদের হার: প্রতিদিন গড়ে জমা পড়ছে ৯টি আবেদন |
বরিশালে বাড়ছে বিবাহবিচ্ছেদের হার: প্রতিদিন ৯টি তালাকের আবেদন ও এক সামাজিক অস্থিরতার গল্প
নিজস্ব প্রতিবেদক, বরিশাল
বরিশালে বাড়ছে বিবাহবিচ্ছেদের হার—এই খবরটি এখন আর কেবল সরকারি নথির পরিসংখ্যান নয়, বরং এক ভয়ংকর সামাজিক বাস্তবতায় রূপ নিয়েছে। একটি সুন্দর আগামী আর সুখের সংসারের স্বপ্ন নিয়ে যারা বিবাহবন্ধনে আবদ্ধ হচ্ছেন, তাদের একটি বড় অংশই কয়েক বছরের মাথায় বিচ্ছেদের পথ বেছে নিচ্ছেন। কীর্তনখোলা নদীর তীরের এই ঐতিহ্যবাহী জনপদে এখন প্রতিদিন গড়ে ৯টি করে সংসার ভাঙছে। জেলা রেজিস্টার কার্যালয়ের সাম্প্রতিক তথ্য বিশ্লেষণে দেখা গেছে, বিচ্ছেদের এই মিছিলে পুরুষের তুলনায় নারীদের আবেদনের সংখ্যা অনেক বেশি। এই প্রবণতা কেবল একটি পরিবারকে ধ্বংস করছে না, বরং পুরো সমাজ কাঠামোর ওপর এক নেতিবাচক প্রভাব ফেলছে।
পরিসংখ্যানের পাতায় বরিশালে বাড়ছে বিবাহবিচ্ছেদের হার
বিগত দুই বছরের তথ্য পর্যালোচনা করলে দেখা যায়, বরিশালে যে হারে বিয়ে নিবন্ধিত হচ্ছে, তার বিপরীতে বিচ্ছেদের সংখ্যাও পাল্লা দিয়ে বাড়ছে। জেলা রেজিস্টার কার্যালয়ের তথ্য অনুসারে, ২০২৩ এবং ২০২৪ সালে জেলায় মোট ১৮ হাজার ৬৪৪টি বিবাহ নিবন্ধিত হয়েছে। এর বিপরীতে একই সময়ে বিচ্ছেদের আবেদন জমা পড়েছে ৬ হাজার ৩৫২টি। অর্থাৎ, নিবন্ধিত বিয়ের প্রায় এক-তৃতীয়াংশই টেকসই হচ্ছে না।
বিশদভাবে বলতে গেলে, ২০২৩ সালে জেলায় ৯ হাজার ৬৬৬টি বিয়ে সম্পন্ন হয়েছিল, যার বিপরীতে বিচ্ছেদ ঘটেছে ৩ হাজার ৫টি। কিন্তু ২০২৪ সালে এসে এই চিত্র আরও উদ্বেগজনক হয়ে দাঁড়িয়েছে। এ বছর ৮ হাজার ৯৭৮টি বিয়ে নিবন্ধিত হলেও বিচ্ছেদের আবেদন পড়েছে ৩ হাজার ৩৪৭টি। অর্থাৎ, আগের বছরের তুলনায় বিয়ের সংখ্যা কমলেও বরিশালে বাড়ছে বিবাহবিচ্ছেদের হার। গড়ে প্রতিদিন ৯টি করে তালাকের আবেদন জমা পড়া এটিই প্রমাণ করে যে, পারিবারিক সহনশীলতা ও সামাজিক বন্ধন ক্রমশ শিথিল হয়ে পড়ছে।
কেন বরিশালে বাড়ছে বিবাহবিচ্ছেদের হার ও নারীদের এগিয়ে যাওয়ার নেপথ্য কারণ
সময়ের পরিবর্তনের সাথে সাথে আমাদের সামাজিক মূল্যবোধেও পরিবর্তন এসেছে। এক সময় বিবাহবিচ্ছেদকে সামাজিকভাবে কলঙ্ক হিসেবে দেখা হলেও বর্তমানে পরিস্থিতির পরিবর্তন ঘটেছে। তবে বরিশালে বাড়ছে বিবাহবিচ্ছেদের হার—এর পেছনে নারীদের আবেদনের আধিক্য সবচেয়ে বেশি লক্ষ্য করা গেছে। জেলা রেজিস্টার মোহসীন মিয়া উল্লেখ করেছেন যে, নারীদের তালাকের আবেদনের প্রবণতা ভবিষ্যতে আরও বাড়তে পারে। এর পেছনে বেশ কিছু বাস্তবসম্মত কারণ রয়েছে:
১. নারীদের আত্মনির্ভরশীলতা ও সচেতনতা: বর্তমান সময়ে নারীরা নিজেদের অধিকার সম্পর্কে অনেক বেশি সচেতন। তারা আর আগের মতো মুখ বুজে নির্যাতন সহ্য করতে রাজি নন। অর্থনৈতিক স্বাবলম্বিতা এবং আইনি সহায়তা পাওয়ার সুযোগ বৃদ্ধি পাওয়ায় নারীরা সম্মানজনক জীবনের আশায় বিচ্ছেদের সিদ্ধান্ত নিচ্ছেন।
২. পারিবারিক সহিংসতা ও যৌতুক: বিয়ের পর অনেক নারীকে যৌতুকের দাবিতে শারীরিক ও মানসিক নির্যাতনের শিকার হতে হয়। যখন সহ্যের সীমা ছাড়িয়ে যায়, তখন নারীরা আইনগতভাবে বিচ্ছেদের পথে হাঁটেন। মূলত নির্যাতনের হাত থেকে বাঁচতেই বরিশালে বাড়ছে বিবাহবিচ্ছেদের হার।
৩. কাবিননামার ১৮ নম্বর ধারার প্রয়োগ: মুসলিম বিবাহ আইনে কাবিননামার ১৮ নম্বর ধারায় স্ত্রীকে তালাক প্রদানের ক্ষমতা দেওয়া হয়েছে। আধুনিক শিক্ষায় শিক্ষিত ও সচেতন নারীরা এখন এই আইনি অধিকারটি বেশি ব্যবহার করছেন, যা বিচ্ছেদের সংখ্যা বৃদ্ধিতে বড় ভূমিকা রাখছে।
সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যম ও বরিশালে বাড়ছে বিবাহবিচ্ছেদের হার
বর্তমান যুগে প্রযুক্তির ছোঁয়া যেমন জীবনকে সহজ করেছে, তেমনি পারিবারিক জীবনে তৈরি করেছে ফাটল। বিচ্ছেদ মামলার তথ্যাদি পর্যালোচনা করলে দেখা যায়, সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমের অপব্যবহার দাম্পত্য কলহের অন্যতম প্রধান কারণ হয়ে দাঁড়িয়েছে। ফেসবুক, হোয়াটসঅ্যাপ বা টিকটকের মাধ্যমে পরিচয়ের পর আবেগবশত বিয়ে হলেও বাস্তব জীবনে তাদের বনিবনা হচ্ছে না।
বরিশালের নারী ও শিশু নির্যাতন দমন ট্রাইব্যুনালের পাবলিক প্রসিকিউটর (পিপি) অ্যাডভোকেট আব্দুল মান্নান মৃধা জানান, অনেক বিচ্ছেদ মামলায় বিবাহবহির্ভূত সম্পর্কের অভিযোগ উঠে আসে। স্বামী বা স্ত্রীর মধ্যে পরকীয়ার সম্পর্ক জানাজানি হওয়ার পর সংসারে যে অবিশ্বাসের সৃষ্টি হয়, তা শেষ পর্যন্ত তালাকের দিকে গড়ায়। এই পরকীয়া ও অবিশ্বাসের কারণেই মূলত বরিশালে বাড়ছে বিবাহবিচ্ছেদের হার।
মাদক ও অনলাইন জুয়ার প্রভাবে বরিশালে বাড়ছে বিবাহবিচ্ছেদের হার
বরিশাল অঞ্চলে তরুণদের মধ্যে মাদকাসক্তি ও অনলাইন জুয়ার প্রবণতা আশঙ্কাজনকভাবে বেড়েছে। অনেক স্বামী মাদকের নেশায় আসক্ত হয়ে পরিবারের প্রতি দায়িত্ব ভুলে যাচ্ছেন। মাদকের টাকা জোগাতে গিয়ে তারা ঘরের আসবাবপত্র বিক্রি থেকে শুরু করে স্ত্রীর ওপর শারীরিক নির্যাতন চালাচ্ছেন। অন্যদিকে, ইদানিং অনলাইন জুয়ার নেশায় পড়ে অনেক পরিবার আর্থিকভাবে নিঃস্ব হয়ে যাচ্ছে। যখন পরিবারের মৌলিক চাহিদা পূরণ করা সম্ভব হয় না এবং স্বামীর আচরণ উগ্র হয়ে ওঠে, তখন স্ত্রী বিচ্ছেদের আবেদন করতে বাধ্য হন। ফলে দিন দিন বরিশালে বাড়ছে বিবাহবিচ্ছেদের হার।
বিশেষজ্ঞ ও আইনি পরামর্শকদের পর্যবেক্ষণ
বেসরকারি সংস্থা 'ব্লাস্ট'-এর কো-অর্ডিনেটর অ্যাডভোকেট শাহিদা বেগম মনে করেন, বিচ্ছেদের হার বাড়ার পেছনে পারিবারিক ও সামাজিক সচেতনতার অভাব বড় দায়ী। তিনি বলেন, "ছোটখাটো ভুল বোঝাবুঝি থেকে অনেক সময় বড় বিবাদ সৃষ্টি হয়। পারিবারিক কাউন্সেলিংয়ের অভাব এবং ধৈর্য না থাকায় দ্রুত বিচ্ছেদের সিদ্ধান্ত নেওয়া হচ্ছে।"
অন্যদিকে, আইনজীবী মহলের মতে, অধিকাংশ বিচ্ছেদ মামলার নথিতে শারীরিক নির্যাতন, স্বামীর বেকারত্ব এবং অবিশ্বাসের কথা উল্লেখ থাকে। বিচ্ছেদ কেবল আইনি প্রক্রিয়া নয়, এর পেছনে থাকা মানসিক ট্রমা একটি প্রজন্মকে পঙ্গু করে দিতে পারে। বিশেষ করে যেসব দম্পতির সন্তান রয়েছে, তাদের বিচ্ছেদের ফলে শিশুদের ভবিষ্যৎ অনিশ্চয়তার মুখে পড়ছে। শিশুদের এই মানসিক বিপর্যয় রোধে এখনই লাগাম টানা দরকার, কারণ বরিশালে বাড়ছে বিবাহবিচ্ছেদের হার কেবল বড়দেরই নয়, ছোটদের জীবনকেও বিপন্ন করছে।
প্রতিকারের উপায় ও সামাজিক উত্তরণ
বরিশালে বাড়ছে বিবাহবিচ্ছেদের হার—এই সংকট থেকে উত্তরণের জন্য প্রয়োজন সমন্বিত উদ্যোগ। সমাজ ও পরিবার পর্যায় থেকে কিছু পদক্ষেপ নেওয়া জরুরি:
পারিবারিক মূল্যবোধের পুনর্জাগরণ: বিয়ে একটি পবিত্র বন্ধন। এই বন্ধনকে টিকিয়ে রাখতে হলে স্বামী-স্ত্রী উভয়কেই সহনশীল হতে হবে। পারিবারিক শিক্ষা ও নৈতিকতা বৃদ্ধির মাধ্যমে বিচ্ছেদের হার কমানো সম্ভব।
বিয়ের আগে কাউন্সেলিং: বিয়ের আগে পাত্র-পাত্রীর মানসিক প্রস্তুতি এবং একে অপরের প্রতি দায়বদ্ধতা নিয়ে কাউন্সেলিং করা জরুরি। অনেক উন্নত দেশে এটি বাধ্যতামূলক হলেও আমাদের দেশে এর চর্চা নেই।
মাদকের বিরুদ্ধে কঠোর অবস্থান: প্রশাসনের উচিত মাদকের সরবরাহ বন্ধে জিরো টলারেন্স নীতি গ্রহণ করা। মাদকাসক্তি কমলে পারিবারিক কলহ অনেকাংশেই কমে যাবে।
ধর্মীয় অনুশাসন ও সামাজিক সচেতনতা: ধর্মীয় শিক্ষার প্রচার ও প্রসারের মাধ্যমে দাম্পত্য জীবনের গুরুত্ব তুলে ধরতে হবে। এছাড়া পাড়া-মহল্লায় সামাজিক সালিশি ও আলোচনার মাধ্যমে বিবাদ মেটানোর সংস্কৃতি ফিরিয়ে আনতে হবে।
একটি সুখী ও সুন্দর আগামীর প্রত্যাশা
পরিসংখ্যানের এই ভয়াবহতা কাটিয়ে উঠতে হলে আমাদের সবাইকে সচেতন হতে হবে। বরিশালে বাড়ছে বিবাহবিচ্ছেদের হার—এই শিরোনামটি আগামীতে যেন বদলে গিয়ে 'বরিশালে বাড়ছে পারিবারিক সুখী জীবনের হার'-এ পরিণত হয়, সেটাই আমাদের কাম্য। সংসার মানেই মান-অভিমান আর ত্যাগের গল্প। এই ত্যাগের মহিমা বুঝে নিয়ে একে অপরের প্রতি বিশ্বস্ত থাকলে কোনো সংসারই ভাঙার উপক্রম হবে না।
সমাজ ও প্রশাসনের পক্ষ থেকে বিচ্ছেদের পেছনের মূল কারণগুলো দূর করতে কার্যকরী পদক্ষেপ নিতে হবে। বিশেষ করে কর্মসংস্থান সৃষ্টি, মাদকমুক্ত সমাজ গঠন এবং নৈতিক শিক্ষার প্রচারই পারে বরিশালের এই সামাজিক ক্ষত নিরাময় করতে। একটি সুস্থ ও সুন্দর সমাজ বিনির্মাণে প্রতিটি পরিবার হোক শান্তির নীড়—এই প্রত্যাশায় সচেতন বরিশালবাসী।
Comments
Post a Comment