 |
| গর্ভাবস্থায় বমি কেন হয়? |
লাইফস্টাইল ডেস্ক:একজন নারীর জীবনে মাতৃত্বের স্বাদ এক অনন্য অনুভূতি। নতুন একটি প্রাণ পৃথিবীতে আসার এই যাত্রাপথ যতটা আনন্দের, শারীরিক পরিবর্তনের কারণে তা অনেক সময় ততটাই চ্যালেঞ্জিং হয়ে ওঠে। গর্ভাবস্থার শুরুর দিকে অধিকাংশ মা যে প্রধান সমস্যাটির মুখোমুখি হন, তা হলো গর্ভাবস্থায় বমি ভাব। চিকিৎসাবিজ্ঞানের ভাষায় একে বলা হয় ‘মর্নিং সিকনেস’ (Morning Sickness)। অনেকে মনে করেন এটি কোনো অসুখ, কিন্তু আসলে এটি হরমোনের পরিবর্তনের একটি স্বাভাবিক প্রতিক্রিয়া। আজকের ফিচারে আমরা জানব গর্ভাবস্থায় বমি কেন হয়, এর পেছনের বিজ্ঞান এবং মা ও অনাগত সন্তানের নিরাপত্তায় আমাদের কী কী সতর্কতা মেনে চলতে হবে।গর্ভাবস্থায় বমি কেন হয় এবং কাদের ঝুঁকি বেশি?
মায়ের পেটে যখন বাচ্চা আসে, তখন তার শরীরে হরমোনের ব্যাপক পরিবর্তন ঘটে। মূলত ‘বিটা এইচসিজি’ (Beta HCG) এবং ‘ইস্ট্রোজেন’ নামক হরমোনের মাত্রা দ্রুত বৃদ্ধি পাওয়ার কারণেই এই গর্ভাবস্থায় বমি ভাব দেখা দেয়। এই হরমোনগুলো গর্ভাবস্থাকে টিকিয়ে রাখতে সাহায্য করে, কিন্তু এর প্রভাবে মায়ের পাকস্থলী অত্যন্ত সংবেদনশীল হয়ে পড়ে এবং হজম প্রক্রিয়া ধীর হয়ে যায়।যদিও একে ‘মর্নিং সিকনেস’ বলা হয়, তবে দিনের যেকোনো সময়েই এই অস্বস্তি হতে পারে। সাধারণত গর্ভাবস্থার ৬ষ্ঠ সপ্তাহ থেকে এটি শুরু হয় এবং ১২তম সপ্তাহ বা প্রথম তিন মাস পর ধীরে ধীরে কমে আসে। বিশেষ করে যাদের প্রথম গর্ভধারণ, যমজ সন্তান অথবা আগে থেকেই মাইগ্রেনের সমস্যা আছে, তাদের ক্ষেত্রে এই সমস্যাটি বেশি দেখা যায়।
ওষুধ সেবনে সতর্কতা: একটি ঐতিহাসিক শিক্ষা
গর্ভাবস্থায় বমি ভাব কমানোর জন্য চিকিৎসকের পরামর্শ ছাড়া কোনো ওষুধ খাওয়া যে কতটা বিপজ্জনক হতে পারে, তার একটি বড় প্রমাণ হলো ‘থ্যালিডোমাইড ট্র্যাজেডি’। আমেরিকা ও ইউরোপে একসময় বিজ্ঞানীরা এমন একটি ওষুধ আবিষ্কার করেছিলেন, যা মায়েরা মর্নিং সিকনেস দূর করার উপায় হিসেবে ব্যবহার করতেন। কিন্তু এর ফলাফল ছিল ভয়াবহ—হাজার হাজার শিশু বিকলাঙ্গ হয়ে জন্মগ্রহণ করেছিল।কারণ, গর্ভাবস্থায় মা যা খান, তা সরাসরি বাচ্চার শরীরে প্রভাব ফেলে। অনেক ওষুধ বাচ্চার ব্রেন, লিভার ও কিডনি ধ্বংস করে দিতে পারে। তাই গর্ভাবস্থায় সামান্য বমি বা মাথা ধরার জন্যও নিজে থেকে ফার্মেসি থেকে ওষুধ কিনে খাওয়া একেবারেই অনুচিত। খুব প্রয়োজন হলে একজন অভিজ্ঞ চিকিৎসকের পরামর্শ নিয়েই কেবল ওষুধ সেবন করা উচিত।
গর্ভাবস্থায় বমি কমানোর ঘরোয়া উপায় ও লাইফস্টাইল
হরমোনের কারণে হওয়া এই সমস্যা পুরোপুরি বন্ধ করা সম্ভব নয়, তবে কিছু নিয়ম মেনে চললে এর তীব্রতা কমানো যায়। নিচে গর্ভাবস্থায় বমি কমানোর ঘরোয়া উপায় গুলো দেওয়া হলো:১. অল্প অল্প করে বারবার খাওয়া: একবারে পেট ভরে না খেয়ে, সারাদিনে অল্প অল্প করে বারবার খাওয়ার অভ্যাস করুন। খালি পেটে থাকলে বমি ভাব বাড়ে।
২. শুকনো খাবার: সকালে ঘুম থেকে ওঠার পর বিছানা ছাড়ার আগেই শুকনো খাবার, যেমন— টোস্ট বিস্কুট বা মুড়ি খেতে পারেন। এটি গর্ভাবস্থায় বমি ভাব কমাতে বেশ কার্যকরী।
৩. আদা ও লেবু: আদা বমি ভাব কমাতে প্রাকৃতিক ওষুধের মতো কাজ করে। আদা চা বা সামান্য আদা চিবিয়ে খাওয়া যেতে পারে।
৪. তেল-চর্বি পরিহার: অতিরিক্ত তেল, ঝাল ও মশলাযুক্ত খাবার এড়িয়ে চলুন। সহজপাচ্য খাবার, যেমন— জাউভাত, সেদ্ধ খাবার বা স্যুপ খাওয়া ভালো।
৫. পর্যাপ্ত বিশ্রাম ও পানি: শরীরকে পানিশূন্য হতে দেওয়া যাবে না। খাওয়ার মাঝে মাঝে পানি পান করতে হবে এবং পর্যাপ্ত ঘুমাতে হবে।
মায়ের দুধ ও বাচ্চার সুরক্ষা
গর্ভাবস্থার এই কঠিন সময় পার করে যখন সন্তান পৃথিবীর আলো দেখে, তখন তার সবচেয়ে বড় সুরক্ষকবচ হলো মায়ের বুকের দুধ। গর্ভাবস্থায় মায়ের শরীর থেকে শিশু পুষ্টি পায়, আর জন্মের পর পায় মায়ের দুধ থেকে। কৃত্রিম দুধের পরিবর্তে বাচ্চাকে মায়ের দুধ খাওয়ানোই বুদ্ধিমানের কাজ, যা বাচ্চার মেধা বিকাশ ও রোগ প্রতিরোধ ক্ষমতা গড়ে তোলে।উপসংহার ও গর্ভবতী মায়ের যত্ন
গর্ভাবস্থায় মায়ের এই শারীরিক কষ্টটুকু সন্তানের ভালোর জন্যই। পরিবারের সদস্যদের, বিশেষ করে স্বামীর উচিত এই সময়ে স্ত্রীর পাশে থাকা। সঠিক গর্ভবতী মায়ের যত্ন, চিকিৎসকের পরামর্শ এবং পুষ্টিকর খাবার নিশ্চিত করলে এই সময়টুকু সহজেই পার করা সম্ভব। যদি বমি খুব বেশি হয় বা মা কিছুই খেতে না পারেন, তবে দেরি না করে দ্রুত চিকিৎসকের শরণাপন্ন হতে হবে।
Comments
Post a Comment