 |
| সম্প্রতি দেশে ৮৮ লাখের বেশি সিম কার্ড বন্ধ করা হয়েছে। |
৮৮ লাখ সিম বন্ধ করার মধ্য দিয়ে দেশের টেলিকম খাতে এক বিশাল পরিবর্তনের সূচনা করেছে বাংলাদেশ টেলিযোগাযোগ নিয়ন্ত্রণ কমিশন (বিটিআরসি)। মূলত দেশের অভ্যন্তরীণ আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতি স্বাভাবিক রাখা, সাইবার অপরাধ নিয়ন্ত্রণ এবং গ্রাহকদের ব্যক্তিগত তথ্যের নিরাপত্তা নিশ্চিত করতেই বিটিআরসি এই কঠোর সিদ্ধান্ত গ্রহণ করেছে। সরকারি নির্দেশনা অনুযায়ী, একজন গ্রাহক তার জাতীয় পরিচয়পত্র (NID) ব্যবহার করে সর্বোচ্চ ১০টি সিম সচল রাখতে পারবেন। এই নির্দিষ্ট সীমার অতিরিক্ত থাকা সিমগুলো চিহ্নিত করে গত নভেম্বর মাস থেকে নিষ্ক্রিয় করার প্রক্রিয়া শুরু হয়, যার ফলশ্রুতিতে দেশজুড়ে এই বিশাল সংখ্যক সিমকার্ড বাতিল করা হয়েছে।
বিটিআরসির অভিযানে ৮৮ লাখ সিম বন্ধ ও বর্তমান পরিস্থিতি
বিটিআরসির সিস্টেমস অ্যান্ড সার্ভিসেস বিভাগ থেকে প্রাপ্ত তথ্য অনুযায়ী, গত বছর থেকেই অবৈধ ও অতিরিক্ত সিম কার্ডের বিরুদ্ধে অভিযান পরিচালনার প্রস্তুতি নেওয়া হয়েছিল। ডাক ও টেলিযোগাযোগ মন্ত্রণালয়ের সরাসরি তদারকিতে এই কার্যক্রম পরিচালিত হয়। সংস্থার মহাপরিচালক ব্রিগেডিয়ার জেনারেল এসএম মনিরুজ্জামান জানিয়েছেন যে, প্রায় ৮৯ লাখ সিম অতিরিক্ত হিসেবে চিহ্নিত করা হয়েছিল। এর মধ্যে আইনি জটিলতা ও মামলাসংক্রান্ত কারণ ছাড়া বাকি প্রায় ৮৮ লাখ সিম বন্ধ করার কাজ সম্পন্ন হয়েছে। বাকি এক লাখ সিমও দ্রুতই স্থায়ীভাবে বন্ধ করে দেওয়া হবে।
এই সিদ্ধান্তের ফলে দেশের মোবাইল ও ইন্টারনেট ব্যবহারকারীর পরিসংখ্যানে একটি বড় ধরনের পতন লক্ষ্য করা গেছে। বিটিআরসির সর্বশেষ প্রতিবেদনে দেখা যায়, গত জুলাই ২০২৫-এ দেশে মোবাইল গ্রাহক ছিল ১৮ কোটি ৮৭ লাখ, যা বর্তমানে কমে ১৮ কোটি ৭০ লাখে দাঁড়িয়েছে। অর্থাৎ, মাত্র কয়েক মাসের ব্যবধানে গ্রাহক সংখ্যা কমেছে প্রায় ১৮ লাখ। শুধু মোবাইল গ্রাহকই নয়, মোবাইল ইন্টারনেট ব্যবহারকারীর সংখ্যাও নাটকীয়ভাবে হ্রাস পেয়েছে।
কেন এই ৮৮ লাখ সিম বন্ধ করার প্রয়োজন হলো?
ডিজিটাল বাংলাদেশের অগ্রযাত্রার সাথে সাথে সাইবার অপরাধের মাত্রাও পাল্লা দিয়ে বেড়েছে। অনেক ক্ষেত্রে দেখা গেছে, একটি এনআইডির বিপরীতে কয়েক ডজন সিম নিবন্ধিত রয়েছে, যা অপরাধীরা বিভিন্ন জালিয়াতি বা নাশকতামূলক কাজে ব্যবহার করত। ভুয়া সিম বা অন্যের নামে নিবন্ধিত সিম ব্যবহার করে সাধারণ মানুষকে প্রতারিত করার ঘটনা নিত্যদিনের বিষয় হয়ে দাঁড়িয়েছিল। এই বিশৃঙ্খলা দূর করতেই সরকার কঠোর অবস্থান নেয়। বিটিআরসির মতে, ৮৮ লাখ সিম বন্ধ করার ফলে এখন অপরাধীদের শনাক্ত করা আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর জন্য অনেক সহজ হবে। গ্রাহকদের বায়োমেট্রিক তথ্যের সাথে ব্যবহৃত সিমের সংখ্যার সামঞ্জস্য নিশ্চিত করা গেলে ব্যক্তিগত সুরক্ষা অনেক গুণ বৃদ্ধি পাবে।
মোবাইল ইন্টারনেট ব্যবহারে বড় প্রভাব
সিম কার্ড সীমিত করার এই সিদ্ধান্তের সবচেয়ে বড় প্রভাব পড়েছে মোবাইল ইন্টারনেট খাতের ওপর। বিটিআরসির তথ্য অনুযায়ী, গত ছয় মাসে মোবাইল ইন্টারনেট ব্যবহারকারীর সংখ্যা কমেছে প্রায় ৬২.৬ লাখ। বর্তমানে দেশে মোবাইল ইন্টারনেট ব্যবহার করছে ১১ কোটি ৫২ লাখ মানুষ, যেখানে গত জুলাইয়ে এই সংখ্যা ছিল ১২ কোটি ১৫ লাখ। এমনকি জুলাই অভ্যুত্থানের সময় এই সংখ্যা ১২ কোটি ৭৫ লাখের ওপরে ছিল।
তথ্যপ্রযুক্তি সংশ্লিষ্টরা মনে করছেন, ৮৮ লাখ সিম বন্ধ হওয়া ছাড়াও ইন্টারনেটের প্যাকেজ মূল্য বৃদ্ধি এবং সরকারের কিছু কড়াকড়ি এই ব্যবহারকারী কমার পেছনে বড় ভূমিকা রেখেছে। তবে মোবাইল ইন্টারনেট কমলেও দেশে ব্রডব্যান্ড বা আইএসপি ইন্টারনেটের চাহিদা বাড়ছে। বর্তমানে দেশে ব্রডব্যান্ড ব্যবহারকারীর সংখ্যা ১ কোটি ৪৬ লাখে পৌঁছেছে।
বিশেষজ্ঞের মতামত ও ভবিষ্যৎ পরিকল্পনা
তথ্যপ্রযুক্তি বিশেষজ্ঞ সুমন আহমেদ সাবির এই পরিস্থিতির ব্যাখ্যা দিতে গিয়ে বলেন, “মোবাইল ব্যবহারকারী কমার ক্ষেত্রে প্রধান দুটি কারণ কাজ করেছে। প্রথমত, একজনের অধিক সিমের সংখ্যা কমিয়ে আনা এবং দ্বিতীয়ত, ব্রডব্যান্ডের সহজলভ্যতা। কোভিডের সময় মানুষের ঘরে বসে মোবাইল ব্যবহারের প্রবণতা বেড়েছিল, যা স্বাভাবিক পরিস্থিতিতে এখন ব্রডব্যান্ডের দিকে স্থানান্তরিত হচ্ছে।” তিনি আরও যোগ করেন যে, ৮৮ লাখ সিম বন্ধ হওয়ার ফলে মানুষ এখন প্রয়োজন অনুযায়ী গুণগত মানসম্পন্ন সেবা বেছে নিচ্ছে।
তবে বিটিআরসি এখানেই থেমে থাকছে না। সরকারের প্রাথমিক লক্ষ্য ছিল ১০টি সিমের সীমা নির্ধারণ করা। কিন্তু মন্ত্রণালয়ের পরবর্তী নির্দেশনায় এই সংখ্যা ৫টিতে নামিয়ে আনার পরিকল্পনা রয়েছে। যদিও সামনে ত্রয়োদশ সংসদ নির্বাচন থাকায় এবং সাধারণ গ্রাহকদের সুবিধার্থে এই মুহূর্তে ৫টি সিমের নিয়ম কার্যকর করা হচ্ছে না। তবে নির্বাচন পরবর্তী সময়ে বিটিআরসি আরও কঠোর পদক্ষেপ নিতে পারে। ব্রিগেডিয়ার জেনারেল এসএম মনিরুজ্জামান বলেন, “১০টি সিমের সীমা নির্ধারণে রাজস্বে তেমন প্রভাব না পড়লেও, ৫টিতে নামিয়ে আনলে মোবাইল অপারেটরদের বাজার ও সরকারি রাজস্বে কিছুটা নেতিবাচক প্রভাব পড়তে পারে। তবে জাতীয় নিরাপত্তার স্বার্থে আমাদের দীর্ঘমেয়াদী পরিকল্পনা রয়েছে।”
৮৮ লাখ সিম বন্ধ হওয়ার পর করণীয় ও নিরাপত্তা সচেতনতা
বিটিআরসির এই বিশাল সংখ্যক সিম নিষ্ক্রিয় করার পর সাধারণ গ্রাহকদের মধ্যে সচেতনতা বাড়ানো জরুরি হয়ে পড়েছে। অনেক গ্রাহক হয়তো জানেনই না যে তাদের এনআইডির বিপরীতে কয়টি সিম চালু রয়েছে। এজন্য বিটিআরসি থেকে বারবার পরামর্শ দেওয়া হচ্ছে যেন প্রত্যেকেই তাদের নিবন্ধিত সিমের সংখ্যা পরীক্ষা করেন। আপনার এনআইডি দিয়ে কয়টি সিম নিবন্ধিত আছে তা জানতে যেকোনো মোবাইল থেকে ১৬০০১# ডায়াল করে পিন নম্বর দিলে বিস্তারিত তথ্য পাওয়া যাবে।
সাম্প্রতিক এই ৮৮ লাখ সিম বন্ধ করার পদক্ষেপটি দেশের ডিজিটাল নিরাপত্তা বলয়কে আরও শক্তিশালী করবে। অবৈধভাবে সিম ব্যবহার করে আর্থিক জালিয়াতি বা সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমে উসকানিমূলক কার্যক্রম চালানোর পথ এখন অনেকটাই রুদ্ধ।
টেলিকম খাতের চ্যালেঞ্জ ও আগামীর সম্ভাবনা
সিম কার্ড কমে যাওয়ায় মোবাইল অপারেটরগুলোর ওপর এক ধরনের বাণিজ্যিক চাপ তৈরি হয়েছে। গ্রাহক সংখ্যা কমে যাওয়ার ফলে ডাটা ব্যবহারের পরিমাণও কিছুটা নিম্নমুখী। তবে বিশেষজ্ঞরা মনে করেন, এটি একটি অস্থায়ী পরিস্থিতি। টেলিকম খাতের এই শুদ্ধি অভিযান শেষ হলে বাজারে প্রকৃত গ্রাহকদের একটি স্বচ্ছ ডেটাবেজ তৈরি হবে। এতে করে অপারেটরগুলো আরও কার্যকর এবং লক্ষ্যভিত্তিক সেবা প্রদান করতে পারবে।
পরিশেষে, দেশের সামগ্রিক পরিস্থিতি এবং নিরাপদ সাইবার স্পেস গড়ার প্রত্যয়ে ৮৮ লাখ সিম বন্ধ করার এই উদ্যোগটি অত্যন্ত সময়োপযোগী। সরকারের এই কঠোর অবস্থানের কারণে একদিকে যেমন অপরাধীরা কোণঠাসা হবে, অন্যদিকে সাধারণ মানুষ একটি সুশৃঙ্খল টেলিকম সেবা উপভোগ করতে পারবে। মোবাইল ইন্টারনেটের গ্রাহক কমলেও ব্রডব্যান্ডের দিকে মানুষের ঝোঁক প্রমাণ করে যে, ডিজিটাল কানেক্টিভিটির ধরণ পাল্টাচ্ছে। আগামীতে ৫টি সিমের সীমা কার্যকর হলে এই খাত আরও বেশি স্বচ্ছ ও সুরক্ষিত হবে বলে আশা করা যায়। টেলিকম খাতের এই আমূল পরিবর্তন এবং ৮৮ লাখ সিম বন্ধ করার নেপথ্যে থাকা জাতীয় নিরাপত্তার বিষয়টিই এখন সর্বমহলে প্রশংসিত হচ্ছে।
সচেতন ব্যবহারকারীর সুরক্ষা কবচ
বর্তমানে যারা একাধিক সিম ব্যবহার করছেন, তাদের উচিত অপ্রয়োজনীয় সিমগুলো নিজ উদ্যোগে নিকটস্থ কাস্টমার কেয়ারে গিয়ে বন্ধ করে দেওয়া। সরকারের আইন অনুযায়ী নিজের নামে থাকা সিমের দায়ভার সম্পূর্ণ ব্যবহারকারীর। সুতরাং, বিটিআরসির এই ৮৮ লাখ সিম বন্ধ করার কার্যক্রমকে কেবল একটি আইনি প্রক্রিয়া হিসেবে না দেখে, নাগরিক দায়িত্ব হিসেবে দেখা উচিত। সুরক্ষিত সাইবার জগত এবং স্থিতিশীল আইনশৃঙ্খলা বজায় রাখতে এই ধরনের সরকারি উদ্যোগের সাথে জনঅংশগ্রহণ অপরিহার্য।
টেলিকম খাতের এই সংস্কারের ফলে সাময়িক কিছু অসুবিধা বা গ্রাহক সংখ্যা কমলেও, দীর্ঘমেয়াদী সুফল পেতে হলে এই পথেই এগোতে হবে। বিটিআরসি ও সরকার এখন শুধু সংখ্যা নয়, বরং সেবার মান ও নিরাপত্তার ওপর বেশি গুরুত্ব দিচ্ছে। তাই ডিজিটাল বাংলাদেশের পরবর্তী ধাপে নিরাপদ টেলিকম ব্যবস্থা নিশ্চিত করতে এই ৮৮ লাখ সিম বন্ধ হওয়ার ঘটনাটি ইতিহাসে একটি গুরুত্বপূর্ণ মাইলফলক হিসেবে চিহ্নিত হয়ে থাকবে।
Comments
Post a Comment