 |
| বিনিয়োগকারীদের সুরক্ষা নিশ্চিত করতে পুঁজিবাজারে কঠোর নজরদারি শুরু হচ্ছে |
পুঁজিবাজার সংস্কার ও তদারকি এখন সময়ের দাবি। দেশের অর্থনৈতিক স্থিতিশীলতা রক্ষায় একটি শক্তিশালী পুঁজিবাজারের বিকল্প নেই। বাংলাদেশ সিকিউরিটিজ অ্যান্ড এক্সচেঞ্জ কমিশন (বিএসইসি) এখন সেই লক্ষ্যেই কাজ করছে। বিএসইসির বর্তমান চেয়ারম্যান খন্দকার রাশেদ মাকসুদ স্পষ্ট জানিয়েছেন, বাজারের আমূল পরিবর্তন আনতে এবং বিনিয়োগকারীদের হারানো আস্থা ফিরিয়ে আনতে সব ধরনের প্রয়োজনীয় পদক্ষেপ নেওয়া হচ্ছে।
বৃহস্পতিবার রাজধানীর একটি হোটেলে আয়োজিত ‘বিএসইসি ক্যাপিটাল মার্কেট জার্নালিজম এক্সিলেন্স অ্যাওয়ার্ডস’ অনুষ্ঠানে তিনি বাজারের ভবিষ্যৎ পরিকল্পনা নিয়ে বিস্তারিত আলোচনা করেন। এই অনুষ্ঠানে মূলত সাংবাদিকদের বস্তুনিষ্ঠ ও অনুসন্ধানী কাজের স্বীকৃতি দেওয়া হলেও, আলোচনার কেন্দ্রবিন্দুতে ছিল বাজারের সংস্কার প্রক্রিয়া।
পুঁজিবাজার সংস্কার ও তদারকি: বিএসইসির নতুন রূপরেখা
বিএসইসির চেয়ারম্যান খন্দকার রাশেদ মাকসুদ তার বক্তব্যে জানান, পুঁজিবাজারকে সঠিক ট্র্যাকে ফিরিয়ে আনতে এরই মধ্যে নানামুখী কার্যক্রম শুরু হয়েছে। তিনি বলেন, “পুঁজিবাজারকে সঠিক পথে ফিরিয়ে আনতে সব ধরণের উদ্যোগ নেবে বিএসইসি। তবে কোনো সিদ্ধান্ত নেওয়ার আগে আমরা বর্তমানের সমস্যাগুলো গভীরভাবে বিশ্লেষণ করছি। ইতিমধ্যে অনেক গুরুত্বপূর্ণ বিষয়ে তদন্ত শুরু হয়েছে।”
চেয়ারম্যানের মতে, তদন্তের মাধ্যমে বাজারের ত্রুটিগুলো চিহ্নিত হওয়ার পরেই শুরু হবে পূর্ণাঙ্গ সংস্কার কার্যক্রম। এক্ষেত্রে পুঁজিবাজার সংস্কার ও তদারকি কার্যক্রমকে সবচেয়ে বেশি গুরুত্ব দেওয়া হচ্ছে। তদারকি ব্যবস্থা যদি শক্তিশালী না হয়, তবে বাজারে শৃঙ্খলা বজায় রাখা কঠিন হয়ে পড়ে। তাই বিএসইসি এখন তদারকি বা মনিটরিং ব্যবস্থাকে আরও আধুনিক এবং কঠোর করার পরিকল্পনা করছে।
তদন্ত প্রতিবেদনের ভিত্তিতেই পরবর্তী পদক্ষেপ
বাজারের সংস্কার নিয়ে কাজ করার সময় স্বচ্ছতাকে প্রাধান্য দেওয়া হচ্ছে। বিএসইসি মনে করে, কেবল তড়িঘড়ি করে কোনো আইন পরিবর্তন করলেই সমাধান আসবে না, বরং প্রতিটি অনিয়মের মূলে পৌঁছাতে হবে। খন্দকার রাশেদ মাকসুদ জানান, সঠিক ধারণা পাওয়ার পরেই সংস্কার কার্যক্রম শুরু হবে। এর মাধ্যমে সাধারণ বিনিয়োগকারীদের সুরক্ষা নিশ্চিত করা সম্ভব হবে।
পুঁজিবাজার সংস্কার ও তদারকি প্রক্রিয়া জোরদার করার ফলে বাজারে কারসাজি চক্রের দৌরাত্ম্য কমে আসবে বলে আশা করছেন সংশ্লিষ্টরা। যখন নিয়ন্ত্রক সংস্থা প্রতিটি লেনদেন এবং তালিকাভুক্ত কোম্পানিগুলোর কার্যক্রমের ওপর কড়া নজর রাখবে, তখন অনৈতিক সুবিধা নেওয়া ব্যক্তিদের চিহ্নিত করা সহজ হবে।
সাংবাদিকতায় শ্রেষ্ঠত্বের স্বীকৃতি ও বিএসইসি অ্যাওয়ার্ডস
পুঁজিবাজারের স্বচ্ছতা নিশ্চিত করতে সাংবাদিকদের ভূমিকা অতুলনীয়। বস্তুনিষ্ঠ সাংবাদিকতা বিনিয়োগকারীদের সঠিক সিদ্ধান্ত নিতে সাহায্য করে। বিএসইসি আয়োজিত ‘ক্যাপিটাল মার্কেট জার্নালিজম এক্সিলেন্স অ্যাওয়ার্ডস’ অনুষ্ঠানে চেয়ারম্যান বিজয়ীদের হাতে নগদ অর্থ ও সনদ তুলে দেন। এই মর্যাদাপূর্ণ পুরস্কারের উদ্দেশ্য হলো দায়িত্বশীল, তথ্যনির্ভর এবং বিশেষ করে অনুসন্ধানী সাংবাদিকতাকে উৎসাহিত করা।
পুরস্কারের ক্ষেত্রে প্রিন্ট, ইলেকট্রনিক এবং অনলাইন—এই তিন ক্যাটাগরি নির্ধারণ করা হয়েছিল। প্রতি ক্যাটাগরিতে একজন মূল বিজয়ী এবং দুইজন বিশেষ পুরস্কার জয়ী হয়েছেন।
প্রিন্ট ক্যাটাগরি:
প্রিন্ট মিডিয়া ক্যাটাগরিতে এবার শ্রেষ্ঠত্ব অর্জন করেছেন ইংরেজি দৈনিক ‘দ্য ডেইলি স্টার’-এর জ্যেষ্ঠ প্রতিবেদক আহসান হাবীব রাসেল। তার তথ্যনির্ভর প্রতিবেদন বিচারকদের দৃষ্টি কেড়েছে। এছাড়া এই ক্যাটাগরিতে বিশেষ সম্মাননা পেয়েছেন দৈনিক ইত্তেফাক-এর জ্যেষ্ঠ প্রতিবেদক জলিল রায়হান মুন্না এবং দৈনিক সমকাল-এর জ্যেষ্ঠ প্রতিবেদক আনোয়ার ইব্রাহীম।
ইলেকট্রনিক মিডিয়া ক্যাটাগরি:
টেলিভিশন সাংবাদিকতায় বিজয়ী হয়েছেন ইন্ডিপেন্ডেন্ট টেলিভিশনের জ্যেষ্ঠ প্রতিবেদক তৌহিদুল ইসলাম রানা। বিশেষ পুরস্কার পেয়েছেন এখন টিভির নিজস্ব প্রতিবেদক আতাউর রহমান এবং যমুনা টেলিভিশনের জ্যেষ্ঠ প্রতিবেদক আলমগীর হোসেন।
অনলাইন নিউজ পোর্টাল ক্যাটাগরি:
আধুনিক সংবাদমাধ্যমের এই যুগে অনলাইন ক্যাটাগরিতে বিজয়ী হয়েছেন রাইজিং বিডির জ্যেষ্ঠ প্রতিবেদক এস এম নুরুজ্জামান তানিম। এছাড়াও বিশেষ পুরস্কার অর্জন করেছেন জাগো নিউজের জ্যেষ্ঠ প্রতিবেদক সাঈদ শিপন এবং বাংলানিউজের জ্যেষ্ঠ প্রতিবেদক এস এম এ কালাম।
পুঁজিবাজার সংস্কার ও তদারকি কার্যক্রমে সাংবাদিকদের ভূমিকা
পুরস্কার প্রাপ্তির পর সাংবাদিকদের পক্ষ থেকে প্রতিক্রিয়া জানান সাঈদ শিপন। তিনি বলেন, “পুঁজিবাজার সাংবাদিকতা অত্যন্ত দায়িত্বশীল একটি ক্ষেত্র। এখানে একটি ভুল তথ্য হাজার হাজার বিনিয়োগকারীর ক্ষতি করতে পারে।” তিনি বিশ্বাস করেন, পুঁজিবাজার সংস্কার ও তদারকি কেবল বিএসইসির কাজ নয়, বরং সাংবাদিকদের লেখনীর মাধ্যমেও বাজারের অনেক অসঙ্গতি সামনে আনা সম্ভব। এতে করে বিনিয়োগকারীদের আস্থা ফিরিয়ে আনা সহজ হয়।
বিএসইসির এই উদ্যোগকে স্বাগত জানিয়ে বিশ্লেষকরা বলছেন, ফেলোশিপ এবং অ্যাওয়ার্ড চালুর ফলে সাংবাদিকরা পুঁজিবাজারের খুঁটিনাটি বিষয়গুলো নিয়ে আরও গভীরভাবে গবেষণা করতে উৎসাহিত হবেন। গবেষণামূলক সাংবাদিকতা যত বাড়বে, বাজারের ভেতরের গোপন কারসাজিগুলো তত বেশি প্রকাশিত হবে, যা নিয়ন্ত্রক সংস্থাকে ব্যবস্থা নিতে সাহায্য করবে।
কেন পুঁজিবাজার সংস্কার ও তদারকি এখন অপরিহার্য?
বাংলাদেশের অর্থনীতি যখন সামনের দিকে এগিয়ে যাচ্ছে, তখন পুঁজিবাজার তার কাঙ্ক্ষিত গতি পাচ্ছিল না। দীর্ঘদিনের অনিয়ম, আইপিও জালিয়াতি এবং সেকেন্ডারি মার্কেটে গুটিকয়েক মানুষের নিয়ন্ত্রণ বাজারকে সাধারণ মানুষের কাছে নেতিবাচক করে তুলেছিল। বিএসইসির নতুন চেয়ারম্যান দায়িত্ব নেওয়ার পর থেকেই এই পরিস্থিতি পরিবর্তনের অঙ্গীকার করেছেন।
একটি বাজার যখন সঠিক নিয়মে চলে না, তখন সাধারণ বিনিয়োগকারীরা পুঁজি হারিয়ে বাজার বিমুখ হন। তাই পুঁজিবাজার সংস্কার ও তদারকি জোরদার করা হলে বাজারে প্রাতিষ্ঠানিক বিনিয়োগ বাড়বে এবং বিদেশি বিনিয়োগকারীরাও আশ্বস্ত হবেন। বিএসইসির পক্ষ থেকে জানানো হয়েছে, প্রথমবার চালু হওয়া এই অ্যাওয়ার্ড এবং ফেলোশিপ প্রোগ্রাম মূলত স্বচ্ছ ও নির্ভরযোগ্য তথ্য প্রচারের একটি মাধ্যম হিসেবে কাজ করবে।
স্বচ্ছতা নিশ্চিত করতে জুরিবোর্ডের কঠোর মূল্যায়ন
এবারের অ্যাওয়ার্ডের জন্য মনোনীতদের চূড়ান্ত করতে একটি দক্ষ ও শক্তিশালী জুরিবোর্ড কাজ করেছে। ছয় সদস্যের এই বোর্ডে ছিলেন ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের প্রথিতযশা শিক্ষক, প্রাজ্ঞ গবেষক, বিএসইসির দক্ষ প্রতিনিধি এবং সাংবাদিক সমাজের প্রতিনিধিরা। প্রতিবেদনের গভীরতা, তথ্যের নির্ভুলতা এবং এটি বাজারের ওপর কী প্রভাব ফেলেছে—এই বিষয়গুলো বিবেচনা করেই বিজয়ীদের নির্বাচন করা হয়েছে।
বিনিয়োগকারীদের আস্থাই মূল লক্ষ্য
বিএসইসি মনে করে, বাজারে বিনিয়োগকারীদের ফেরাতে হলে আগে বাজারকে আস্থার জায়গায় নিতে হবে। আর সেই আস্থা আসবে কেবল যখন বিনিয়োগকারীরা দেখবেন যে নিয়ন্ত্রক সংস্থা সক্রিয়ভাবে কাজ করছে। চেয়ারম্যান খন্দকার রাশেদ মাকসুদের নেতৃত্বে পুঁজিবাজার সংস্কার ও তদারকি কর্মসূচিটি এমনভাবে সাজানো হচ্ছে যাতে দীর্ঘমেয়াদী সুফল পাওয়া যায়।
তদারকি কার্যক্রমের আওতায় ব্রোকারেজ হাউজ, মার্চেন্ট ব্যাংক এবং তালিকাভুক্ত কোম্পানির আর্থিক প্রতিবেদনের স্বচ্ছতা যাচাই করা হবে। কোনো কোম্পানি যদি বিনিয়োগকারীদের ঠকায় বা ভুল তথ্য দেয়, তবে তাদের বিরুদ্ধে কঠোর আইনি ব্যবস্থা নেওয়া হবে। এর ফলে বাজারে একটি সুষ্ঠু পরিবেশ তৈরি হবে।
তথ্যনির্ভর সাংবাদিকতা ও আগামীর পুঁজিবাজার
বিএসইসি আয়োজিত এই মর্যাদাপূর্ণ পুরস্কার বিতরণী অনুষ্ঠানে বক্তারা বলেন, সঠিক তথ্যের অভাবে অনেক সময় গুজব ছড়ায়। আর গুজব পুঁজিবাজারের বড় শত্রু। তাই স্বচ্ছ, নির্ভরযোগ্য এবং গবেষণামূলক সাংবাদিকতাকে উৎসাহিত করতেই এবারই প্রথম ফেলোশিপ এবং অ্যাওয়ার্ড চালু করেছে নিয়ন্ত্রক সংস্থা।
সবশেষে বলা যায়, পুঁজিবাজার সংস্কার ও তদারকি প্রক্রিয়াটি চলমান থাকলে এবং গণমাধ্যম যদি তাদের অতন্দ্র প্রহরীর ভূমিকা পালন করে, তবে খুব দ্রুতই বাংলাদেশের পুঁজিবাজার দক্ষিণ এশিয়ার মধ্যে একটি শক্তিশালী বাজার হিসেবে আত্মপ্রকাশ করবে। বিনিয়োগকারীরা তাদের অর্থের সুরক্ষা পাবেন এবং দেশি-বিদেশি বিনিয়োগে গতি ফিরবে।
বিএসইসি চেয়ারম্যানের এই দূরদর্শী পদক্ষেপ এবং সাংবাদিকদের সম্মানিত করার উদ্যোগটি নিঃসন্দেহে প্রশংসার দাবি রাখে। পুঁজিবাজারকে এগিয়ে নিতে সবার সম্মিলিত প্রচেষ্টাই এখন সবচেয়ে বড় শক্তি।
বাজারের নিয়মিত আপডেট, সঠিক বিশ্লেষণ এবং বিনিয়োগ বিষয়ক তথ্যের জন্য আমাদের নিউজ পোর্টালে চোখ রাখুন। পুঁজিবাজার কেবল লাভের জায়গা নয়, সঠিক জ্ঞান ও তদারকির মাধ্যমে এটি হতে পারে আপনার নিরাপদ আয়ের অন্যতম উৎস।
Comments
Post a Comment