 |
| মৃত মা-বাবার জন্য দোয়া ও ক্ষমা প্রার্থনা। |
মৃত মা-বাবার জন্য দোয়া হলো একজন সুসন্তানের পক্ষ থেকে তাদের পরকালীন জীবনের শ্রেষ্ঠ পাথেয়। ইসলামি শরিয়তে পিতামাতার অধিকার কেবল তাদের জীবিত থাকা পর্যন্ত সীমাবদ্ধ নয়, বরং তাদের ইন্তেকালের পর আরও বৃদ্ধি পায়। কারণ, কবরের অন্ধকার ও একাকী জীবনে তারা সন্তানের পক্ষ থেকে পাঠানো সওয়াব ও দোয়ার জন্য অধীর অপেক্ষায় থাকেন।
নিজস্ব প্রতিবেদক | ধর্ম ও জীবন
মানুষের জীবনের সবচেয়ে বড় সম্পদ তার মা-বাবা। শৈশবের সেই অসহায় মুহূর্তগুলোতে যখন একটি শিশু নিজের প্রয়োজনটুকুও বলতে পারত না, তখন মা-বাবার অকৃত্রিম ভালোবাসা আর অক্লান্ত পরিশ্রমই তাকে পৃথিবীর আলো-বাতাসে বড় করে তুলেছে। কিন্তু প্রকৃতির অমোঘ নিয়মে একদিন তাদের এই পৃথিবী ছেড়ে চলে যেতে হয়। মা-বাবার চিরবিদায়ের পর সন্তানের মন যখন বেদনায় ভারাক্রান্ত হয়, তখন ইসলাম আমাদের শিখিয়েছে কীভাবে সেই শোককে শক্তিতে রূপান্তর করে তাদের কল্যাণে কাজে লাগানো যায়। আর এই কল্যাণের প্রধান মাধ্যম হলো মৃত মা-বাবার জন্য দোয়া করা।
ইসলামি বিধান অনুযায়ী, মৃত্যুর পর মানুষের আমলনামা বন্ধ হয়ে গেলেও সন্তানের দোয়া মৃত ব্যক্তির কবরে প্রশান্তি বয়ে আনে। এটি কেবল একটি আবেগীয় বিষয় নয়, বরং এটি কুরআন ও সুন্নাহ দ্বারা প্রমাণিত একটি শক্তিশালী ইবাদত। মা-বাবার জন্য দোয়ার গুরুত্ব ও পদ্ধতি নিয়ে সাজানো হয়েছে আজকের এই বিশেষ প্রতিবেদন।
আমলনামা জারির মাধ্যম: নেক সন্তানের দোয়া
সহিহ মুসলিমের ৪৩১০ নম্বর হাদিসে রাসুলুল্লাহ (সা.) একটি অত্যন্ত আশাব্যঞ্জক কথা বলেছেন। তিনি বলেন, ‘মানুষ যখন মৃত্যুবরণ করে, তখন তার আমল বন্ধ হয়ে যায়। কিন্তু তিনটি মাধ্যম থেকে সে সওয়াব পেতে থাকে। প্রথমটি হলো সাদকায়ে জারিয়া, দ্বিতীয়টি এমন জ্ঞান যা দ্বারা মানুষ উপকৃত হয় এবং তৃতীয়টি হলো নেক সন্তান, যে তার মৃত মা-বাবার জন্য সবসময় দোয়া করে।’
এই হাদিসটি স্পষ্ট করে দেয় যে, কোনো সন্তান যদি দ্বীনদার হয় এবং সে যদি নিয়মিত মৃত মা-বাবার জন্য দোয়া করে, তবে কবরে থাকা পিতামাতার আমলনামায় সওয়াব যোগ হতে থাকে। অনেক সময় মৃত ব্যক্তি কবরে বসে হঠাৎ দেখেন তার মর্যাদা বৃদ্ধি পাচ্ছে, তখন তিনি বিস্মিত হয়ে আল্লাহর কাছে এর কারণ জানতে চান। তখন আল্লাহ তাআলা তাকে জানান যে, তোমার দুনিয়াতে রেখে আসা সন্তানের প্রার্থনার কারণেই আজ তোমার এই সম্মান বৃদ্ধি পেয়েছে।
কোরআনের আলোয় মা-বাবার জন্য বিশেষ তিনটি দোয়া
আল্লাহ তাআলা পবিত্র কোরআনে বিভিন্ন স্থানে আমাদের শিখিয়েছেন কীভাবে মা-বাবার প্রতি বিনয়ী হতে হবে এবং তাদের জন্য কী শব্দে প্রার্থনা করতে হবে। বিশেষ করে যারা মা-বাবাকে হারিয়েছেন, তাদের জন্য কোরআনে বর্ণিত এই তিনটি দোয়া অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ:
১. রহমত ও শান্তির দোয়া:
মা-বাবার প্রতি আল্লাহর রহমত কামনার জন্য সুরা বনি ইসরাইলের ২৪ নম্বর আয়াতে একটি চমৎকার দোয়া শেখানো হয়েছে। দোয়াটি হলো:
‘রাব্বির হামহুমা, কামা রাব্বায়ানি সাগিরা।’
যার অর্থ: ‘হে আমার প্রতিপালক, তাদের উভয়ের প্রতি দয়া করুন; যেভাবে তারা আমাকে শৈশবকালে লালন-পালন করেছেন।’
সন্তান যখন এই দোয়াটি পড়ে, তখন সে মূলত আল্লাহর কাছে আবেদন জানায় যে, শৈশবে সে যেমন মা-বাবার দয়ার ওপর নির্ভরশীল ছিল, আজ তার মা-বাবাও ঠিক তেমনি আল্লাহর দয়ার মুখাপেক্ষী। মৃত মা-বাবার জন্য দোয়া হিসেবে এই আয়াতটি বিশ্বজুড়ে মুসলমানদের কাছে সর্বাধিক পরিচিত।
২. হাশরের ময়দানে ক্ষমা প্রার্থনার দোয়া:
কিয়ামতের দিন যখন বিচার কাজ শুরু হবে, সেই সময়টি হবে অত্যন্ত ভয়াবহ। সেই কঠিন মুহূর্তে মা-বাবার মুক্তির জন্য সুরা ইবরাহিমের ৪১ নম্বর আয়াতে বলা হয়েছে:
‘রাব্বানাগ ফিরলি ওয়ালি ওয়ালিদাইয়া, ওয়ালিল মু’মিনিনা ইয়াওমা ইয়াক্বুমুল হিসাব।’
অর্থ: ‘হে আমাদের প্রতিপালক! যেদিন হিসাব কায়েম হবে, সেদিন আমাকে, আমার মা-বাবাকে এবং সকল মুমিনকে ক্ষমা করে দিন।’
হাশরের কঠিন ময়দানে নিজের পাশাপাশি মৃত মা-বাবার জন্য দোয়া করার এই শিক্ষা আমাদের ইমানের অংশ।
৩. সর্বজনীন ক্ষমার দোয়া:
সুরা নুহের ২৮ নম্বর আয়াতে নুহ (আ.)-এর একটি আরজি বর্ণিত হয়েছে যা অত্যন্ত তাৎপর্যপূর্ণ। দোয়াটি হলো:
‘রাব্বিগ ফিরলি ওয়ালি ওয়ালিদাইয়া, ওয়া লিমান দাখালা বাইতিয়া মু’মিনাও ওয়ালিল মু’মিনিনা ওয়াল মু’মিনাত।’
অর্থ: ‘হে আমার রব! আমাকে, আমার মা-বাবাকে, যে আমার ঘরে ঈমানদার হয়ে প্রবেশ করবে তাকে এবং সকল মুমিন নারী-পুরুষকে ক্ষমা করুন।’
মা-বাবার জন্য এই বিশেষ দোয়াটি পাঠ করলে কেবল পিতামাতাই নন, বরং সকল মুমিন মুসলমানের জন্য দোয়া করা হয়, যা অত্যন্ত সওয়াবের কাজ।
সন্তানের দোয়ায় কবরে মর্যাদা বৃদ্ধি
হাদিসে বর্ণিত হয়েছে যে, সন্তানের ক্ষমা প্রার্থনার কারণে জান্নাতে মা-বাবার স্তর বা মর্যাদা বাড়িয়ে দেওয়া হয়। আল-আদাবুল মুফরাদ গ্রন্থে উল্লেখ আছে, মৃত ব্যক্তি যখন তার উচ্চ মর্যাদা দেখে অবাক হন, তখন তাকে বলা হয় যে তার সন্তান তার জন্য ‘এস্তেগফার’ বা ক্ষমা প্রার্থনা করেছে। এ থেকে বোঝা যায়, মৃত মা-বাবার জন্য দোয়া কেবল তাদের গুনাহ মাফ করে না, বরং তাদের জান্নাতের সুউচ্চ মাকাম লাভে সহায়তা করে।
মা-বাবা দুনিয়াতে থাকাকালীন আমাদের অনেক আবদার পূরণ করেছেন, আমাদের মুখে হাসি ফোটাতে নিজেরা কষ্ট করেছেন। আজ তারা এমন এক জগতে আছেন যেখানে তাদের নিজস্ব কোনো কাজ করার ক্ষমতা নেই। এই সময়ে সন্তানের পক্ষ থেকে একটি ছোট্ট দোয়া তাদের জন্য দুনিয়ার সমস্ত সম্পদের চেয়েও বেশি মূল্যবান।
কেন দোয়া কবুল হয়?
আল্লাহ তাআলা সন্তানের দোয়াকে কেন এত গুরুত্ব দেন? এর উত্তর হলো, মা-বাবার প্রতি সন্তানের ভালোবাসা থাকে অকৃত্রিম। যখন কোনো সন্তান সেজদায় গিয়ে চোখের পানি ফেলে তার মৃত মা-বাবার জন্য দোয়া করে, তখন সেই আরজি আল্লাহর আরশে পৌঁছে যায়। আল্লাহ তাআলা দয়ালু, তিনি বান্দার এই কাকুতি-মিনতি ফিরিয়ে দেন না। বিশেষ করে সন্তান যদি সৎ পথের পথিক হয়, তবে তার দোয়ার কার্যকারিতা অনেক বেড়ে যায়।
দোয়া ছাড়াও অন্যান্য করণীয়
মা-বাবার ইন্তেকালের পর কেবল দোয়া করলেই দায়িত্ব শেষ হয় না। দোয়া হলো মূল ভিত্তি, তবে এর পাশাপাশি আরও কিছু কাজ করার পরামর্শ দিয়েছেন ইসলামি স্কলারগণ:
দান-সদকা করা: মা-বাবার নামে গরিব-দুঃখীকে সাহায্য করা বা কোনো জনকল্যাণমূলক কাজে অর্থ ব্যয় করা।
কুরআন তিলাওয়াত: কুরআন তিলাওয়াত করে তার সওয়াব মা-বাবার রূহের মাগফিরাতের জন্য দান করা।
মা-বাবার বন্ধুদের সম্মান: রাসুলুল্লাহ (সা.) বলেছেন, মা-বাবার বন্ধুদের সাথে সুসম্পর্ক রাখা এবং তাদের সম্মান করা পিতামাতার প্রতি সদাচরণেরই একটি অংশ।
অসিয়ত পূরণ: তারা যদি কোনো বৈধ অসিয়ত বা ঋণ রেখে যান, তবে তা দ্রুত পরিশোধ করা সন্তানের নৈতিক দায়িত্ব।
তবে এই সবকিছুর কেন্দ্রবিন্দুতে থাকতে হবে দোয়া। কারণ অর্থ বা সম্পদ সবার না-ও থাকতে পারে, কিন্তু আল্লাহর কাছে প্রার্থনা করার শক্তি সবারই আছে। তাই প্রতিদিনের ইবাদতে মৃত মা-বাবার জন্য দোয়া রাখা জরুরি।
অবহেলা নয়, ভালোবাসায় সিক্ত হোক তাদের কবর
দুর্ভাগ্যবশত, বর্তমান ব্যস্ত জীবনে আমরা অনেকেই মা-বাবাকে হারানোর পর তাদের কথা ভুলে যাই। দুনিয়ার মোহে পড়ে তাদের কবরের খবর নেওয়া বা তাদের জন্য দুই হাত তুলে মোনাজাত করার সময় আমাদের হয় না। কিন্তু মনে রাখতে হবে, একদিন আমাদেরও একই পথে যেতে হবে। আজ আমরা আমাদের মা-বাবার জন্য যা করব, ভবিষ্যতে আমাদের সন্তানরাও আমাদের জন্য তাই করবে।
তাই আসুন, পাঁচ ওয়াক্ত নামাজের পর অন্তত কয়েক সেকেন্ড সময় বের করে আমরা বলি— ‘হে আল্লাহ, আমার মা-বাবাকে মাফ করে দিন।’ বিশেষ করে জুমার দিন, রমজান মাস বা শেষ রাতের দোয়া অত্যন্ত কবুলযোগ্য। এই সময়গুলোতে মৃত মা-বাবার জন্য দোয়া করলে তারা কবরে শান্তি অনুভব করেন।
পরিশেষে বলা যায়, মা-বাবা হলো জান্নাতের দরজা। তারা দুনিয়াতে বেঁচে থাকাকালীন যেমন আমাদের জন্য রহমত, মৃত্যুর পরও তাদের সেবা করার সুযোগ দোয়া ও সদকার মাধ্যমে বিদ্যমান থাকে। একজন প্রকৃত মুমিন সন্তান কখনোই তার মা-বাবাকে ভুলে থাকতে পারে না।
আল্লাহ সুবহানাহু ওয়া তাআলা আমাদের প্রত্যেককে পিতামাতার প্রতি অনুগত হওয়ার এবং নিয়মিত মৃত মা-বাবার জন্য দোয়া করার তৌফিক দান করুন। তাদের কবরকে জান্নাতের টুকরো বানিয়ে দিন এবং আমাদের সবাইকে জান্নাতুল ফেরদাউসে পুনরায় একত্রিত হওয়ার সুযোগ করে দিন। আমিন।
Comments
Post a Comment