 |
| আইপিও শেয়ার দর নির্ধারণ প্রক্রিয়ায় কঠোর পরিবর্তন এনেছে বিএসইসি। |
আইপিও শেয়ার দর নির্ধারণ প্রক্রিয়ায় স্বচ্ছতা আনতে এবং বিনিয়োগকারীদের স্বার্থ সুরক্ষায় নতুন পাবলিক ইস্যু বিধিমালা চূড়ান্ত করেছে বাংলাদেশ সিকিউরিটিজ অ্যান্ড এক্সচেঞ্জ কমিশন (বিএসইসি)। নিয়ন্ত্রক সংস্থাটির মতে, এই নতুন নিয়মের ফলে শেয়ারবাজারে কৃত্রিম দর প্রস্তাব, কার্টেল ও প্রাইস ম্যানিপুলেশনের সুযোগ অনেকাংশে কমে আসবে। বুধবার (১৪ জানুয়ারি) এক সংবাদ সম্মেলনে বিএসইসির মুখপাত্র ও পরিচালক মোহাম্মদ আবুল কালাম এই তথ্য নিশ্চিত করেন। তিনি জানান, নতুন এই বিধিমালার মাধ্যমে শেয়ারবাজার একটি স্বচ্ছ ও বাজারনির্ভর কাঠামোর দিকে এগিয়ে যাবে।
বিএসইসির পক্ষ থেকে জানানো হয়েছে, নতুন এই বিধিমালাটি কোনো একক সিদ্ধান্তে নয়, বরং বাজারের সব অংশীজন বা স্টেকহোল্ডারদের সরাসরি মতামত ও সুপারিশের ভিত্তিতে তৈরি করা হয়েছে। খসড়া প্রকাশের পর সাধারণ বিনিয়োগকারী ও সংশ্লিষ্ট পক্ষগুলো থেকে মোট ২২০টি মন্তব্য পাওয়া যায়, যার মধ্যে ১৭০টিই ছিল সাধারণ বিনিয়োগকারীদের। এই বিপুল সংখ্যক মতামতের প্রতিফলন ঘটিয়ে আইপিও শেয়ার দর নির্ধারণ সংক্রান্ত বিধিমালাটি সংশোধন ও পরিমার্জন করা হয়েছে।
সংস্কারের পটভূমি ও প্রয়োজনীয়তা
দেশের শেয়ারবাজারে দীর্ঘ সময় ধরে আইপিও প্রক্রিয়ায় স্বচ্ছতার অভাব নিয়ে নানা আলোচনা-সমালোচনা ছিল। বিশেষ করে বুক বিল্ডিং পদ্ধতিতে শেয়ারের দাম অনেক ক্ষেত্রে প্রকৃত মূল্যের চেয়ে বেশি দেখানো হতো বলে অভিযোগ ছিল। বিএসইসির মুখপাত্র মোহাম্মদ আবুল কালাম বলেন, ২০০৬ সাল থেকে আইপিও প্রক্রিয়ার বিভিন্ন দিক যেমন—মেরিট বিবেচনা, সরেজমিনে পরিদর্শন এবং স্টক এক্সচেঞ্জের সুপারিশের মতো বিষয়গুলো নিয়ে বিতর্ক ছিল। এসব সমস্যা সমাধানে আইপিও শেয়ার দর নির্ধারণ ব্যবস্থাকে ঢেলে সাজানো হয়েছে।
২০২০ সালের সংশোধিত রুলস নিয়ে সমালোচনা করে মুখপাত্র জানান, সে সময় যেভাবে দর নির্ধারণ করা হতো, তা প্রকৃত অর্থে বুক বিল্ডিং ছিল না; বরং তা ছিল কার্যত ফিক্সড প্রাইস পদ্ধতির একটি পরিবর্তিত রূপ। সেই সীমাবদ্ধতা কাটিয়ে এবার একটি কার্যকর এবং বাজারনির্ভর আইপিও শেয়ার দর নির্ধারণ ব্যবস্থা চালুর উদ্যোগ নিয়েছে কমিশন।
কার্টেল ও ম্যানিপুলেশন রোধে কঠোর পদক্ষেপ
নতুন বিধিমালায় বিএসইসি কার্টেল গঠন এবং কৃত্রিম দর প্রস্তাবের বিরুদ্ধে জিরো টলারেন্স নীতি গ্রহণ করেছে। কার্টেল বলতে মূলত একাধিক ব্যক্তি বা প্রতিষ্ঠানের গোপন সমঝোতাকে বোঝায়, যার মাধ্যমে তারা জোটবদ্ধ হয়ে বাজারের স্বাভাবিক গতি প্রকৃতি নষ্ট করে দেয় এবং কৃত্রিমভাবে দাম বাড়িয়ে বা কমিয়ে সাধারণ বিনিয়োগকারীদের ক্ষতিগ্রস্ত করে।
বিএসইসি জানিয়েছে, এখন থেকে কার্টেল গঠন করে আইপিও শেয়ার দর নির্ধারণ করার কোনো সুযোগ থাকবে না। কেউ যদি তার আর্থিক সক্ষমতার বাইরে গিয়ে শেয়ারের উচ্চমূল্য প্রস্তাব করে, তবে তার বিরুদ্ধে কঠোর শাস্তিমূলক ব্যবস্থা নেওয়া হবে। এর মাধ্যমে দর প্রস্তাবে বিনিয়োগকারীদের দায়িত্বশীলতা নিশ্চিত করা হবে। এই ধরনের অনিয়ম ঠেকাতে বিধিমালায় ৬টি সুনির্দিষ্ট শর্তারোপ করা হয়েছে এবং নিয়ম ভঙ্গকারীদের জন্য জরিমানাসহ আইনি ব্যবস্থার বিধান রাখা হয়েছে।
বুক বিল্ডিং ও ভ্যালুয়েশন প্রক্রিয়ায় স্বচ্ছতা
নতুন বিধিমালার অন্যতম প্রধান লক্ষ্য হলো ফিক্সড প্রাইস নির্ভরতা কমিয়ে বাজারনির্ভর বুক বিল্ডিং ব্যবস্থাকে আরও শক্তিশালী করা। অতীতে ফিক্সড প্রাইস পদ্ধতিতে অনেক ক্ষেত্রে দরকষাকষির মাধ্যমে দাম ঠিক হতো, যা বাজারভিত্তিক ছিল না এবং এতে নৈতিক ঝুঁকির সম্ভাবনা থাকত। এই ঝুঁকি কমাতেই ভ্যালুয়েশন প্রক্রিয়ার মাধ্যমে আইপিও শেয়ার দর নির্ধারণ করার নিয়ম আরও কঠোর করা হয়েছে।
এখন থেকে ইস্যুকারী কোম্পানি এবং ইস্যু ম্যানেজারকে গাণিতিক ও যৌক্তিকভাবে শেয়ারের 'ইন্ডিকেটিভ প্রাইস' বা নির্দেশক মূল্য প্রমাণ করতে হবে। এরপর রোডশোর মাধ্যমে যোগ্য বিনিয়োগকারীদের আগ্রহ যাচাই করা হবে। নতুন নিয়মে কমপক্ষে ৪০ শতাংশ চাহিদার ভিত্তিতে এই ইন্ডিকেটিভ প্রাইস যাচাই বা ভ্যালিডেশন করতে হবে। এর ফলে শুধুমাত্র একটি মনগড়া মূল্য প্রস্তাব করলেই চলবে না; সেই দামে কতজন বিনিয়োগকারী শেয়ার কিনতে আগ্রহী এবং তাদের আর্থিক সক্ষমতা কতটুকু, সেটিও কঠোরভাবে যাচাই করা হবে। মূলত সঠিক উপায়ে আইপিও শেয়ার দর নির্ধারণ নিশ্চিত করাই এই প্রক্রিয়ার উদ্দেশ্য।
টাস্কফোর্সের সংস্কার কার্যক্রম
বিএসইসি গঠিত বিশেষ টাস্কফোর্স তিনটি প্রধান বিষয়কে গুরুত্ব দিয়ে কাজ করছে—মিউচুয়াল ফান্ড, আইপিও এবং মার্জিন রুলস। সংবাদ সম্মেলনে জানানো হয়, এই তিনটি খাতেই বড় ধরনের সংস্কার কার্যক্রম সম্পন্ন হয়েছে। এছাড়া কর্পোরেট গভর্ন্যান্স ও অডিটরস প্যানেল সংক্রান্ত বিষয়ে আরও কিছু সংস্কার প্রস্তাব রয়েছে, যা পর্যায়ক্রমে বাস্তবায়ন করা হবে।
বিএসইসির মতে, দীর্ঘদিনের অনিয়ম দূর করে একটি বিনিয়োগবান্ধব পরিবেশ তৈরি করাই এই সংস্কারের মূল উদ্দেশ্য। আইপিও শেয়ার দর নির্ধারণ প্রক্রিয়ায় আধুনিকায়ন আনলে একদিকে যেমন ভালো মানের কোম্পানি বাজারে আসতে আগ্রহী হবে, অন্যদিকে সাধারণ বিনিয়োগকারীদের মধ্যেও আস্থার সংকট কাটবে।
বাজারনির্ভর আগামীর প্রত্যাশা
সংবাদ সম্মেলনে বিএসইসির নির্বাহী পরিচালক হাসান মাহমুদ, অতিরিক্ত পরিচালক লুৎফুল কবির এবং যুগ্ম পরিচালক ও জনসংযোগ কর্মকর্তা শরিফুল আলম উপস্থিত ছিলেন। কর্মকর্তারা জানান, সাংবাদিক ও বাজার সংশ্লিষ্টরা দীর্ঘ সময় ধরে আইপিও প্রক্রিয়ার যেসব ত্রুটি তুলে ধরেছেন, সেগুলোর সমাধান করার সর্বোচ্চ চেষ্টা করা হয়েছে এই নতুন বিধিমালায়।
বিএসইসির বিশ্বাস, নতুন পদ্ধতিতে আইপিও শেয়ার দর নির্ধারণ করা হলে শেয়ারবাজার আরও স্বচ্ছ ও গতিশীল হবে। কার্টেল গঠন করে যারা এতদিন বাজারকে প্রভাবিত করার চেষ্টা করত, তারা নতুন আইনের মারপ্যাঁচে আইনি বাধার মুখে পড়বে। এতে করে প্রকৃত ও দক্ষ বিনিয়োগকারীদের প্রাধান্য বাড়বে এবং বাজারের দীর্ঘমেয়াদী স্থিতিশীলতা বজায় থাকবে।
বিনিয়োগকারীদের উদ্দেশ্যে বিএসইসির বার্তা হলো—সংস্কারের এই সুফল পেতে কিছুটা সময় লাগলেও, এটি বাজারের ভিত মজবুত করবে। যখন আইপিও শেয়ার দর নির্ধারণ পুরোপুরি স্বচ্ছ ও গাণিতিক ভিত্তির ওপর দাঁড়াবে, তখন শেয়ারবাজারে কারসাজির ভয় কাটিয়ে সাধারণ মানুষ নিশ্চিন্তে বিনিয়োগ করতে পারবে।
সব মিলিয়ে, বিএসইসির এই নতুন পদক্ষেপ শেয়ারবাজারের জন্য একটি ইতিবাচক মাইলফলক হিসেবে দেখা হচ্ছে। সাধারণ বিনিয়োগকারীদের পক্ষ থেকে যে ১৭০টি মতামত পাওয়া গেছে, তা বাস্তবায়ন করার মাধ্যমে কমিশন প্রমাণ করেছে যে তারা একটি অন্তর্ভুক্তিমূলক ও বিনিয়োগকারী-বান্ধব বাজার ব্যবস্থা গড়ে তুলতে বদ্ধপরিকর। স্বচ্ছ উপায়ে আইপিও শেয়ার দর নির্ধারণ প্রক্রিয়াই হতে পারে বাংলাদেশের শেয়ারবাজারকে বিশ্বমানের করে তোলার প্রথম ধাপ।
পুঁজিবাজার বিশ্লেষকরা মনে করছেন, এই সংস্কারের সফল বাস্তবায়ন নির্ভর করছে বিএসইসির কঠোর নজরদারির ওপর। যদি নতুন রুলসগুলো যথাযথভাবে প্রয়োগ করা হয়, তবে বাজারের প্রতি মানুষের হারানো আস্থা পুনরায় ফিরে আসবে এবং আইপিও বাজারে সুস্থ প্রতিযোগিতা নিশ্চিত হবে। দেশের অর্থনীতির টেকসই উন্নয়নের জন্য একটি শক্তিশালী এবং স্বচ্ছ আইপিও শেয়ার দর নির্ধারণ ব্যবস্থা অপরিহার্য, যা এই নতুন বিধিমালার মাধ্যমে অর্জিত হবে বলে আশা করা হচ্ছে।
Comments
Post a Comment