 |
| একনজরে বিভিন্ন জাতীয় সংসদ নির্বাচনে জামায়াতে ইসলামীর প্রাপ্ত আসন সংখ্যা। |
নিজস্ব প্রতিবেদক | ঢাকা
জামায়াতের সংসদীয় নির্বাচনের ফলাফল বিশ্লেষণ করলে দেখা যায়, বাংলাদেশের রাজনীতির চড়াই-উতরাইয়ে এই দলটির অবস্থান বরাবরই আলোচনার কেন্দ্রবিন্দুতে ছিল। ১৯৭৯ সালে শুরু হওয়া সংসদীয় যাত্রায় দলটি কখনো এককভাবে, আবার কখনো বড় কোনো রাজনৈতিক দলের সঙ্গে জোটবদ্ধ হয়ে নির্বাচনের মাঠে নিজেদের শক্তির জানান দিয়েছে। বাংলাদেশের ক্ষমতার পালাবদলে এবং জাতীয় সংসদের আইন প্রণয়নে দলটির ভূমিকা বিভিন্ন সময়ে নানাভাবে আলোচিত হয়েছে। ২০২৬ সালের আসন্ন ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচনকে সামনে রেখে জামায়াতে ইসলামী যখন পুনরায় বড় প্রস্তুতির কথা বলছে, তখন স্বাভাবিকভাবেই তাদের অতীত ইতিহাসের দিকে নজর পড়ছে সাধারণ মানুষ ও রাজনৈতিক বিশ্লেষকদের।
সূচনালগ্ন: জামায়াতের সংসদীয় নির্বাচনের ফলাফল ও প্রাথমিক প্রেক্ষাপট
স্বাধীনতার পরবর্তী রাজনৈতিক প্রেক্ষাপটে ১৯৭৯ সালের দ্বিতীয় জাতীয় সংসদ নির্বাচনের মাধ্যমে জামায়াতে ইসলামীর সংসদীয় রাজনীতির সূচনা হয়। সেই সময়ে দলটি সরাসরি নিজস্ব নামে নির্বাচনে অংশ নিতে না পেরে ‘ইসলামী ডেমোক্রেটিক লীগ’ (IDL) নামক একটি জোটের ব্যানারে লড়াই করে। এই জোট থেকে জামায়াতের সংসদীয় নির্বাচনের ফলাফল ছিল ৬টি আসন লাভ। এর মাধ্যমে দলটি প্রথমবারের মতো জাতীয় সংসদে নিজেদের কণ্ঠস্বর তোলার সুযোগ পায়।
এরপর ১৯৮৬ সালের তৃতীয় জাতীয় সংসদ নির্বাচন দলটির জন্য একটি বড় পরীক্ষা ছিল। এই নির্বাচনে তারা প্রথমবারের মতো এককভাবে এবং নিজস্ব প্রতীকে অংশগ্রহণ করে। নানা প্রতিকূলতা সত্ত্বেও সেই নির্বাচনে জামায়াত ১০টি আসনে জয়লাভ করে। তবে ১৯৮৮ সালের নির্বাচনটি দেশের প্রায় সব প্রধান রাজনৈতিক দলের মতো জামায়াতও বর্জন করেছিল, যার ফলে সেই সময় দলটির কোনো সংসদীয় সক্রিয়তা ছিল না।
১৯৯১-এর অভাবনীয় সাফল্য: জামায়াতের সংসদীয় নির্বাচনের ফলাফল
বাংলাদেশের রাজনৈতিক ইতিহাসে ১৯৯১ সালের পঞ্চম জাতীয় সংসদ নির্বাচনটি ছিল অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। স্বৈরাচার বিরোধী আন্দোলনের পর এই নির্বাচনে জামায়াতে ইসলামী এককভাবে অংশ নিয়ে নিজেদের ইতিহাসের সর্বোচ্চ সাফল্য অর্জন করে। ১৯৯১ সালে জামায়াতের সংসদীয় নির্বাচনের ফলাফল ছিল ১৮টি আসনে বিশাল জয়। সে সময় কোনো বড় দল এককভাবে সরকার গঠনের মতো সংখ্যাগরিষ্ঠতা না পাওয়ায় জামায়াতের সমর্থন অত্যন্ত জরুরি হয়ে পড়েছিল। তারা বিএনপিকে সমর্থন দিয়ে সরকার গঠনে সহায়তা করে এবং জাতীয় রাজনীতিতে একটি প্রভাবশালী ‘ফ্যাক্টর’ হিসেবে আবির্ভূত হয়।
১৯৯৬ ও ২০০১: ভোটের রাজনীতিতে উত্থান-পতন
১৯৯১ সালের সাফল্যের পর ১৯৯৬ সালের জুন মাসে অনুষ্ঠিত সপ্তম জাতীয় সংসদ নির্বাচনে দলটি বড় ধরনের হোঁচট খায়। এককভাবে লড়াই করতে গিয়ে তারা মাত্র ৩টি আসন পায়। এই পরাজয় দলটিকে তাদের নির্বাচনী কৌশল পুনরায় ভাবিয়ে তোলে। ১৯৯৬-এর এই বিপর্যয়ের পর তারা উপলব্ধি করে যে, বাংলাদেশের বর্তমান মেরুকরণের রাজনীতিতে এককভাবে লড়াই করা বেশ কঠিন।
এই উপলব্ধি থেকেই ২০০১ সালের নির্বাচনে তারা বিএনপির নেতৃত্বাধীন চার দলীয় জোটে শরিক হয়। জোটবদ্ধভাবে নির্বাচন করার ফলে ২০০১ সালে জামায়াতের সংসদীয় নির্বাচনের ফলাফল পুনরায় চাঙ্গা হয়ে ওঠে এবং তারা ১৭টি আসনে জয়লাভ করে। এই জয় জামায়াতকে প্রথমবারের মতো সরকারের মন্ত্রিসভায় স্থান করে দেয়, যা তাদের সাংগঠনিক ও রাজনৈতিক ভিত্তি আরও মজবুত করে।
২০০৮ সাল এবং নিবন্ধন হারানোর সংকট
২০০৮ সালের নবম জাতীয় সংসদ নির্বাচনেও জামায়াত বিএনপির সঙ্গে জোটবদ্ধ হয়ে লড়াই করে। তবে দেশব্যাপী রাজনৈতিক পরিবর্তনের ঢেউ এবং তরুণ ভোটারদের মনস্তাত্ত্বিক পরিবর্তনের কারণে সেই নির্বাচনে জামায়াত বড় ধরণের বিপর্যয়ের মুখে পড়ে। ২০০৮ সালে জামায়াতের সংসদীয় নির্বাচনের ফলাফল নেমে আসে মাত্র ২টি আসনে।
পরবর্তী সময়ে ২০১৩ সালে উচ্চ আদালতের এক রায়ে জামায়াতে ইসলামীর রাজনৈতিক নিবন্ধন বাতিল করা হয়। এই আইনি জটিলতার কারণে ২০১৪ এবং ২০১৮ সালের নির্বাচনে দলটি তাদের দলীয় প্রতীক ‘দাঁড়িপাল্লা’ নিয়ে অংশ নিতে পারেনি। ২০১৮ সালে দলটির প্রার্থীরা জোটের হয়ে বা স্বতন্ত্রভাবে অংশ নিলেও কোনো আসন পেতে সমর্থ হয়নি।
এক নজরে জামায়াতের সংসদীয় নির্বাচনের ফলাফল (সারণী)
নিচের তালিকায় ১৯৭৯ থেকে ২০০৮ সাল পর্যন্ত দলটির সংসদীয় সফলতার একটি সংক্ষিপ্ত চিত্র দেওয়া হলো:
| ১৯৭৯ | জোটবদ্ধ (IDL) | ০৬ |
| ১৯৮৬ | এককভাবে | ১০ |
| ১৯৯১ | এককভাবে | ১৮ |
| ১৯৯৬ | এককভাবে | ০৩ |
| ২০০১ | ৪-দলীয় জোট | ১৭ |
| ২০০৮ | ৪-দলীয় জোট | ০২ |
| ২০১৪/২০১৮ | নিবন্ধনহীন | ০০ |
২০২৬ সালের নির্বাচন: নতুন জোট ও বিশাল লক্ষ্যমাত্রা
বর্তমানে বাংলাদেশের রাজনীতিতে এক নতুন বাতাস বইছে। ২০২৪ সালের রাজনৈতিক পটপরিবর্তনের পর জামায়াতে ইসলামী পুনরায় পূর্ণ উদ্যমে সক্রিয় হয়েছে। ২০২৬ সালের ফেব্রুয়ারিতে অনুষ্ঠিতব্য ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচনকে সামনে রেখে দলটি এখন থেকেই মাঠ গোছাতে শুরু করেছে। রাজনৈতিক বিশ্লেষকদের মতে, এবারের জামায়াতের সংসদীয় নির্বাচনের ফলাফল অতীতের যেকোনো সময়ের চেয়ে ভিন্ন হতে পারে।
আগামী নির্বাচনকে সামনে রেখে জামায়াত একটি ১১-দলীয় নির্বাচনী ঐক্য গঠন করেছে। আসন ভাগাভাগির প্রাথমিক তথ্য অনুযায়ী, এই জোটের পক্ষে জামায়াতে ইসলামী ১৭৯টি আসনে প্রার্থী দেওয়ার জোরালো প্রস্তুতি নিচ্ছে। এটি দলটির ইতিহাসে সংসদীয় নির্বাচনের জন্য নেওয়া সবচেয়ে বড় প্রস্তুতি হিসেবে দেখা হচ্ছে। দীর্ঘ সময় ক্ষমতার বাইরে থাকা এবং সাংগঠনিক কাজ তৃণমূল পর্যন্ত বিস্তৃত করায় দলটি এবার বড় ধরনের প্রত্যাশা নিয়ে মাঠে নামছে।
ভোটের রাজনীতিতে জামায়াতের প্রভাব ও কৌশল
বাংলাদেশের নির্বাচনী রাজনীতিতে জামায়াতের একটি সুসংহত ভোটব্যাংক রয়েছে। যদিও আসন সংখ্যায় সব সময় তার প্রতিফলন দেখা যায় না, তবে অনেক আসনেই জয়-পরাজয়ের নির্ণায়ক শক্তি হয়ে দাঁড়ায় তাদের ভোট। বিশেষ করে উত্তরবঙ্গ, সিলেট এবং উপকূলীয় জেলাগুলোতে দলটির একক প্রভাব বেশ শক্তিশালী। আগামী নির্বাচনে ১৭৯টি আসনে লড়াই করার পরিকল্পনা প্রমাণ করে যে, তারা এখন আর ছোট কোনো শক্তির তকমা নিয়ে থাকতে রাজি নয়।
নির্বাচনী বিশ্লেষণে নতুন প্রজন্মের দৃষ্টিভঙ্গি
বর্তমান প্রজন্মের ভোটারদের কাছে রাজনীতির সমীকরণ অনেক পাল্টে গেছে। জামায়াতে ইসলামীও তাদের এই বিশাল প্রস্তুতিতে নতুন প্রজন্মের কথা মাথায় রাখছে। সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যম থেকে শুরু করে তৃণমূলের গণসংযোগ—সবখানেই তারা নিজেদের আধুনিক ও জনকল্যাণমুখী হিসেবে উপস্থাপন করার চেষ্টা করছে। ২০২৬ সালের নির্বাচনে জামায়াতের সংসদীয় নির্বাচনের ফলাফল কেমন হবে, তা অনেকাংশেই নির্ভর করবে নিরপেক্ষ নির্বাচন কমিশন এবং সাধারণ ভোটারদের স্বতঃস্ফূর্ত অংশগ্রহণের ওপর।
উপসংহারের পরিবর্তে: আগামীর চ্যালেঞ্জ ও রাজনৈতিক ভবিষ্যৎ
বাংলাদেশের সংসদীয় রাজনীতির ইতিহাসে জামায়াতে ইসলামী এক অবিচ্ছেদ্য অংশ হিসেবে রয়ে গেছে। ১৯৭৯ সালের ৬টি আসন থেকে শুরু করে ১৯৯১ সালের ১৮টি আসন, কিংবা পরবর্তী সময়ের চড়াই-উতরাই—সবই দলটির টিকে থাকার লড়াইয়ের গল্প বলে। তবে ২০২৬ সালের নির্বাচন হবে তাদের জন্য সবচেয়ে বড় চ্যালেঞ্জ। নিবন্ধন হারানো থেকে শুরু করে পুনরায় রাজনীতির মূলধারায় আসা এবং ১৭৯টি আসনে লড়াইয়ের ঘোষণা—সব মিলিয়ে দেশের মানুষ গভীর আগ্রহে অপেক্ষা করছে দেখার জন্য যে, ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচনে জামায়াতের সংসদীয় নির্বাচনের ফলাফল শেষ পর্যন্ত কোন দিকে মোড় নেয়। গণতান্ত্রিক এই যাত্রায় ভোটারদের রায়ই চূড়ান্ত, আর সেই রায়ের প্রতিফলন ঘটবে আগামী নির্বাচনে।
Comments
Post a Comment