S

সবএক

সব তথ্য এক ঠিকানায়

Loading...
🔴 স্বাগতম আমাদের পোর্টালে! সর্বশেষ প্রযুক্তির খবরের জন্য সাথে থাকুন। 🔴 ব্রেকিং: নতুন স্মার্টফোন বাজারে এসেছে! 🔴 সর্বশেষ আপডেটের জন্য আমাদের সোশ্যাল মিডিয়া ফলো করুন।

পবিত্র শবে মেরাজের আমল ও গুরুত্ব: ইসলামের সঠিক বিধান

January 15, 2026

 

পবিত্র শবে মেরাজের আমল ও মেরাজ থেকে প্রাপ্ত শিক্ষা।
মেরাজের মূল শিক্ষা হলো পাঁচ ওয়াক্ত নামাজ সময়মতো আদায় করা।

নিজস্ব প্রতিবেদক | ধর্ম ও জীবন

ইসলামি বিশ্বাস অনুযায়ী, ‘লাইলাতুল মেরাজ’ বা শবে মেরাজ হলো সেই রাত, যে রাতে মহানবী (সা.) মহান আল্লাহর বিশেষ আমন্ত্রণে ঊর্ধ্বাকাশে গমন করেছিলেন। এটি কেবল একটি ভ্রমণ ছিল না, বরং এটি ছিল মানবজাতির জন্য আল্লাহর পক্ষ থেকে এক মহান নিদর্শন এবং উপহার লাভের রাত। তবে শরিয়তের মাপকাঠিতে পবিত্র শবে মেরাজের আমল কেমন হওয়া উচিত এবং এই রাতকে কেন্দ্র করে প্রচলিত প্রথাগুলোর ভিত্তি কতটুকু, তা জানা প্রতিটি মুমিনের জন্য আবশ্যক।

শবে মেরাজ: এক অলৌকিক সফরের ইতিবৃত্ত

মেরাজের ঘটনাটি ঘটেছিল নবুয়তের দশম বর্ষে। সেই সময়টি ছিল রাসূলুল্লাহ (সা.)-এর জন্য অত্যন্ত কষ্টের। তিনি তাঁর পরম হিতাকাঙ্ক্ষী চাচা আবু তালিব এবং প্রিয়তমা স্ত্রী খাদিজা (রা.)-কে হারান। এই শোকের সময়ে আল্লাহ তাআলা তাঁর প্রিয় রাসূলকে সান্ত্বনা দিতে এবং নিজের কুদরত দেখাতে মেরাজের মহান সফরে ডেকে নেন।

পবিত্র কোরআনের সূরা বনী ইসরাইলের প্রথম আয়াতে এই সফরের ঘোষণা দেওয়া হয়েছে। আল্লাহ বলেন, "পবিত্র সেই সত্তা, যিনি তাঁর বান্দাকে রাতে ভ্রমণ করিয়েছেন মসজিদে হারাম থেকে মসজিদে আকসা পর্যন্ত।" এই দীর্ঘ সফরে রাসূল (সা.) বোরাক নামক বিশেষ বাহনে চড়ে বায়তুল মুকাদ্দাস যান এবং সেখানে সকল নবীর ইমামতি করেন। এরপর তিনি সাত আসমান পাড়ি দিয়ে সিদরাতুল মুনতাহা হয়ে আরশে আজিমে আল্লাহর দিদার লাভ করেন। এই বিশাল ঘটনার প্রেক্ষাপটে মুসলিম বিশ্বে পবিত্র শবে মেরাজের আমল নিয়ে ব্যাপক আগ্রহ তৈরি হয়েছে।

পবিত্র শবে মেরাজের আমল ও বিশেষ ইবাদত সংক্রান্ত বিধান

শবে মেরাজ ইসলামের ইতিহাসে অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ একটি অধ্যায় হলেও, এই রাতকে কেন্দ্র করে নির্দিষ্ট কোনো আমলের হুকুম রাসূল (সা.) সরাসরি দিয়ে যাননি। হাদিস শরিফ বা সাহাবায়ে কেরামদের জীবনী পর্যালোচনা করলে দেখা যায়, তাঁরা ২৭ রজবকে কেন্দ্র করে আলাদা কোনো উৎসবে মেতে উঠতেন না।

ইসলামি স্কলারদের মতে, পবিত্র শবে মেরাজের আমল হিসেবে বিশেষ কোনো ‘শবে মেরাজের নামাজ’ বা নির্দিষ্ট কোনো দোয়া কোরআন-হাদিস দ্বারা প্রমাণিত নয়। রাসূল (সা.) এই রাতের ঘটনার পর অনেক বছর বেঁচে ছিলেন, কিন্তু তিনি কখনো সাহাবীদের নিয়ে এই রাতে বিশেষ কোনো আমল করেননি। তাই ইবাদতের নামে এমন কিছু করা উচিত নয় যা দ্বীনের অংশ নয় বা যা রাসূল (সা.)-এর সুন্নাহর বহির্ভূত।

পবিত্র শবে মেরাজের আমল হিসেবে প্রচলিত নফল ইবাদত

অনেকেই জানতে চান, এই রাতে কি তবে কোনো ইবাদতই করা যাবে না? বিষয়টি মোটেও তেমন নয়। নফল ইবাদত যেকোনো সময়ই সওয়াবের কাজ। কেউ যদি মহান আল্লাহর সন্তুষ্টির জন্য রাতে জেগে কোরআন তেলাওয়াত করেন, জিকির করেন বা নফল নামাজ আদায় করেন, তবে তিনি অবশ্যই সওয়াব পাবেন। তবে একে পবিত্র শবে মেরাজের আমল হিসেবে বাধ্যতামূলক মনে করা যাবে না।

সাধারণ নফল ইবাদত হিসেবে রাত জাগাতে কোনো বাধা নেই, কিন্তু একে যদি কেউ শরিয়তের সুন্নাত বা ওয়াজিব মনে করে পালন করে, তবে তা বিদআতের পর্যায়ভুক্ত হওয়ার আশঙ্কা থাকে। ইসলামের সৌন্দর্য হলো রাসূল (সা.)-এর দেখানো পথে চলা। তাই অতিরিক্ত আবেগ নয়, বরং সুন্নাহর আলোকেই আমাদের ইবাদত হওয়া উচিত।

২৭ রজব তারিখের রোজা ও ইসলামি দৃষ্টিভঙ্গি

আমাদের সমাজে অনেকের ধারণা, ২৭ রজব তারিখে রোজা রাখা অনেক সওয়াবের কাজ। কেউ কেউ একে আশুরা বা আরাফার রোজার মতো সুন্নাত মনে করেন। তবে প্রকৃত সত্য হলো, শবে মেরাজ উপলক্ষে রোজা রাখার ব্যাপারে কোনো সহিহ হাদিস পাওয়া যায় না। রজব মাস একটি বরকতময় মাস এবং রাসূল (সা.) এই পুরো মাসে বেশি বেশি নফল রোজা রাখতেন। তবে কেবল ২৭ তারিখকে নির্দিষ্ট করে রোজা রাখাকে সুন্নাত মনে করা সঠিক নয়। কেউ যদি রজব মাসের আমল হিসেবে নফল রোজা রাখেন, তবে সওয়াব পাবেন, কিন্তু একে পবিত্র শবে মেরাজের আমল হিসেবে বিশেষ ফজিলতপূর্ণ ভাবার পক্ষে কোনো শক্তিশালী দলিল নেই।

পবিত্র শবে মেরাজের আমল বনাম প্রচলিত কুসংস্কার

বর্তমানে শবে মেরাজকে কেন্দ্র করে আলোকসজ্জা, হালুয়া-রুটি বা শিরনি বিতরণের যে কালচার বা সংস্কৃতি দেখা যায়, তার কোনো ভিত্তি ইসলামে নেই। অনেক ক্ষেত্রে দেখা যায়, মানুষ নামাজ কালাম ছেড়ে দিয়ে কেবল শিরনি বিতরণ বা মিলাদ মাহফিল আয়োজনকেই বড় ইবাদত মনে করে। কিন্তু ইসলামে ইবাদতের মূল ভিত্তি হলো ইখলাস বা একাগ্রতা। শিরনি বিতরণ বা খাবারের আয়োজনকে পবিত্র শবে মেরাজের আমল হিসেবে প্রতিষ্ঠা করার চেষ্টা করা সুন্নাহ পরিপন্থী। এটি দ্বীনের কোনো কাজ নয়, বরং লোকজ সংস্কৃতি। আমাদের উচিত এসব কুসংস্কার থেকে দূরে থেকে ইসলামের মূল শিক্ষার দিকে মনোনিবেশ করা।

মেরাজ থেকে প্রাপ্ত মহান উপহার: পাঁচ ওয়াক্ত নামাজ

মেরাজের রাতে উম্মতে মুহাম্মদির জন্য সবচেয়ে বড় উপহার ছিল পাঁচ ওয়াক্ত নামাজ। শুরুতে ৫০ ওয়াক্তের বিধান থাকলেও আল্লাহর বিশেষ রহমতে তা কমিয়ে ৫ ওয়াক্ত করা হয়। রাসূল (সা.) বলেছেন, "নামাজ হলো মুমিনের মেরাজ।" অর্থাৎ একজন মুমিন যখন গভীর একাগ্রতার সঙ্গে নামাজ আদায় করেন, তখন তিনি আধ্যাত্মিকভাবে আল্লাহর সান্নিধ্যে পৌঁছে যান। তাই পবিত্র শবে মেরাজের আমল হিসেবে আমাদের সবচেয়ে বেশি গুরুত্ব দেওয়া উচিত পাঁচ ওয়াক্ত নামাজ সময়মতো আদায়ের ওপর। যারা বছরের অন্য সময় নামাজ পড়েন না, কেবল শবে মেরাজে রাত জাগেন, তাঁদের ইবাদত লক্ষ্যভ্রষ্ট।

মেরাজের ঘটনার শিক্ষা ও নৈতিক জীবন

মেরাজের সফরে রাসূল (সা.)-কে জান্নাত ও জাহান্নামের বিভিন্ন দৃশ্য দেখানো হয়েছিল। সেখান থেকে আমরা গুরুত্বপূর্ণ কিছু নৈতিক শিক্ষা পাই। যেমন—
১. অন্যের গিবত বা পরনিন্দা না করা।
২. এতিমের মাল আত্মসাৎ না করা।
৩. ব্যভিচার ও অশ্লীলতা থেকে দূরে থাকা।
৪. শিরক বর্জন করে এক আল্লাহর ইবাদত করা।
৫. পিতা-মাতার সেবা ও প্রতিবেশীর হক আদায় করা।

এই শিক্ষাগুলো আমাদের প্রাত্যহিক জীবনে বাস্তবায়ন করাই হলো পবিত্র শবে মেরাজের আমল এর প্রকৃত সার্থকতা। মেরাজ আমাদের শেখায় আল্লাহর সার্বভৌমত্ব ও পরকালীন জীবনের গুরুত্ব।

রমজানের প্রস্তুতি ও রজব মাসের মাহাত্ম্য

রজব মাস আসার অর্থই হলো রমজানের আগাম বার্তা। রাসূল (সা.) এই মাস থেকেই রমজানের মানসিক প্রস্তুতি শুরু করতেন। তিনি দোয়া করতেন, "হে আল্লাহ! আমাদের জন্য রজব ও শাবান মাসকে বরকতময় করুন এবং আমাদের রমজান পর্যন্ত পৌঁছে দিন।" এই মাসে বেশি বেশি ক্ষমা প্রার্থনা (ইস্তিগফার) করা এবং আল্লাহর নৈকট্য লাভের চেষ্টা করাই মুমিনের কাজ। পবিত্র শবে মেরাজের আমল খুঁজতে গিয়ে আমরা যেন রজব মাসের মূল ফজিলত ভুলে না যাই। এই মাসটি হলো আমাদের ইমানি শক্তিকে ঝালাই করে নেওয়ার এবং গুনাহ থেকে তওবা করার এক বিশেষ সুযোগ।

ইসলামের সঠিক পথ অনুসরণের প্রয়োজনীয়তা

ইসলাম একটি পূর্ণাঙ্গ জীবনবিধান। এখানে নিজের পক্ষ থেকে কোনো কিছু যোগ করা বা বিয়োগ করার সুযোগ নেই। শবে মেরাজ একটি ঐতিহাসিক ও অলৌকিক সত্য ঘটনা। এই রাতের মর্যাদা অপরিসীম। তবে সেই মর্যাদাকে সঠিক পদ্ধতিতে সম্মান জানাতে হবে। পবিত্র শবে মেরাজের আমল নিয়ে অতিরঞ্জিত কিছু না করে আমাদের উচিত রাসূল (সা.)-এর সুন্নাহকে আঁকড়ে ধরা। লোকদেখানো ইবাদত নয়, বরং মহান আল্লাহর সন্তুষ্টির জন্য নিভৃতে আল্লাহর ইবাদত করাই শ্রেয়।

মুমিনের করণীয় ও দ্বীনি দিকনির্দেশনা

শবে মেরাজ আমাদের আধ্যাত্মিক উন্নতির কথা বলে। এই রাত আমাদের শিখিয়ে দেয় যে, একজন মানুষ ইমান ও আমলের মাধ্যমে কতটা উচ্চতায় পৌঁছাতে পারেন। আমরা যদি নামাজি হই, পরনিন্দা থেকে বিরত থাকি এবং মানুষের সেবা করি, তবেই মেরাজের শিক্ষা আমাদের জীবনে প্রতিফলিত হবে। পবিত্র শবে মেরাজের আমল হিসেবে নির্দিষ্ট কোনো ধরাবাঁধা নিয়মের পেছনে না ছুটে আমরা যদি নিয়মিত কুরআন তেলাওয়াত, তাহাজ্জুদ এবং তওবায় আত্মনিয়োগ করি, তবেই তা আমাদের জন্য কল্যাণকর হবে।

পরিশেষে বলা যায়, শবে মেরাজের মূল নির্যাস হলো আল্লাহর হুকুম পালনে অবিচল থাকা এবং রাসূল (সা.)-এর সুন্নাহকে জীবনের প্রতিটি ক্ষেত্রে অগ্রাধিকার দেওয়া। মহান আল্লাহ আমাদের সবাইকে সঠিক দ্বীনি জ্ঞান দান করুন এবং বিদআত ও কুসংস্কারমুক্ত থেকে বিশুদ্ধ ইবাদত করার তৌফিক দান করুন। আমিন।



Comments