S

সবএক

সব তথ্য এক ঠিকানায়

Loading...
🔴 স্বাগতম আমাদের পোর্টালে! সর্বশেষ প্রযুক্তির খবরের জন্য সাথে থাকুন। 🔴 ব্রেকিং: নতুন স্মার্টফোন বাজারে এসেছে! 🔴 সর্বশেষ আপডেটের জন্য আমাদের সোশ্যাল মিডিয়া ফলো করুন।

মুলাদীতে এসএসসি পরীক্ষার্থীর আত্ম-হত্যা: মোবাইলের জন্য অভিমান

January 28, 2026

 

মুলাদীতে এসএসসি পরীক্ষার্থীর আত্মহত্যা এবং শোকাহত পরিবার
মুলাদীতে মায়ের সঙ্গে অভিমান করে আত্মহত্যা করা স্কুলছাত্রী জৈতিমনি রায়।

তুচ্ছ কারণে ঝরল প্রাণ: মোবাইল ফোন নিয়ে মায়ের সঙ্গে অভিমানে মুলাদীতে এসএসসি পরীক্ষার্থীর আত্ম-হত্যা

নিজস্ব প্রতিবেদক, বরিশাল | আপডেট: ২৯ জানুয়ারি ২০২৫

সামনেই ছিল জীবনের অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ ধাপ এসএসসি পরীক্ষা। প্রস্তুতিও চলছিল সেই অনুযায়ী। কিন্তু সামান্য একটি মোবাইল ফোন ব্যবহারকে কেন্দ্র করে মুহূর্তের অভিমানে সব শেষ হয়ে গেল। মায়ের শাসন মেনে নিতে না পেরে অভিমান করে আত্মহননের পথ বেছে নিলেন জৈতিমনি রায় (১৫) নামের এক কিশোরী। হৃদয়বিদারক মুলাদীতে এসএসসি পরীক্ষার্থীর আত্ম-হত্যার এই ঘটনাটি ঘটেছে বরিশালের মুলাদী পৌর সদরের বেইলি ব্রিজ এলাকায়।

গত মঙ্গলবার (২৭ জানুয়ারি) রাতে ঘটা এই মর্মান্তিক ঘটনাটি জানাজানি হলে এলাকায় শোকের ছায়া নেমে আসে। পুলিশ ও নিহতের পরিবার সূত্রে জানা গেছে, পড়াশোনা বাদ দিয়ে মোবাইল ফোন ব্যবহার করায় মা শাসন করেছিলেন, আর সেই অভিমান থেকেই গলায় ফাঁস লাগিয়ে আত্মহত্যা করে ওই স্কুলছাত্রী। মুলাদীতে এসএসসি পরীক্ষার্থীর আত্ম-হত্যার এই ঘটনা আবারও আমাদের চোখে আঙুল দিয়ে দেখিয়ে দিল কিশোর-কিশোরীদের মানসিক স্বাস্থ্যের ভঙ্গুর অবস্থার চিত্র।

মুলাদীতে এসএসসি পরীক্ষার্থীর আত্ম-হত্যা: ঘটনার আদ্যপান্ত

মুলাদী পৌর শহরের বেইলি ব্রিজ এলাকার (নগর এলাকা) একটি বাসায় মায়ের সঙ্গে বসবাস করত জৈতিমনি। তার মা ঝুমা সরকার পেশায় একজন শিক্ষক। তিনি মুলাদী সরকারি মাহমুদজান মাধ্যমিক বিদ্যালয়ের সহকারী শিক্ষিকা হিসেবে কর্মরত। জৈতিমনিও একই বিদ্যালয়ের শিক্ষার্থী ছিল এবং এবছরই তার এসএসসি পরীক্ষায় অংশগ্রহণ করার কথা ছিল। কিন্তু পরীক্ষার টেবিলে বসার আগেই মুলাদীতে এসএসসি পরীক্ষার্থীর আত্ম-হত্যার খবরটি সবাইকে স্তব্ধ করে দিয়েছে।

ঘটনার দিন, অর্থাৎ মঙ্গলবার সন্ধ্যায় প্রাইভেট পড়া শেষে বাসায় ফিরতে কিছুটা দেরি হয় জৈতিমনির। বাসায় ফিরে রাত ৯টার দিকে সে পড়ার টেবিলে না বসে মোবাইল ফোন নিয়ে ব্যস্ত হয়ে পড়ে। সামনেই বোর্ড পরীক্ষা, তাই মেয়ের ভবিষ্যতের কথা চিন্তা করে মা ঝুমা সরকার তাকে মোবাইল ফোন রেখে মনোযোগ দিয়ে পড়াশোনা করতে বলেন। এটি ছিল একজন সচেতন মায়ের স্বাভাবিক শাসন। কিন্তু মায়ের এই সামান্য শাসনটুকু মেনে নিতে পারেনি কিশোরী মন। রাগের বশবর্তী হয়ে সে নিজের ঘরের দরজা বন্ধ করে দেয়। মা ভেবেছিলেন, মেয়ে হয়তো পড়াশোনা করছে বা রাগ করে চুপচাপ বসে আছে। কিন্তু কিছুক্ষণ পরেই ঘটে যায় সেই অনাকাঙ্ক্ষিত ঘটনা, যা সৃষ্টি করে মুলাদীতে এসএসসি পরীক্ষার্থীর আত্ম-হত্যার মতো ট্র্যাজেডি।

রাত সাড়ে ৯টার দিকে রাতের খাবার খাওয়ার জন্য মেয়েকে ডাকতে যান ঝুমা সরকার। কিন্তু ভেতর থেকে কোনো সাড়া না পেয়ে তিনি চিন্তিত হয়ে পড়েন। অনেক ডাকাডাকির পর দরজার ফাঁক দিয়ে উঁকি দিতেই দেখেন, মেয়ের নিথর দেহ ঝুলছে। মায়ের চিৎকারে আশপাশের লোকজন ছুটে আসে এবং পুলিশে খবর দেয়।

পুলিশের ভাষ্য ও মুলাদীতে এসএসসি পরীক্ষার্থীর আত্ম-হত্যার তদন্ত

ঘটনার খবর পেয়ে দ্রুত ঘটনাস্থলে পৌঁছায় মুলাদী থানা পুলিশ। মঙ্গলবার রাত ১০টার দিকে পুলিশ সদস্যরা ওই বাসা থেকে স্কুলছাত্রীর ঝুলন্ত মরদেহ উদ্ধার করেন। আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর তৎপরতায় দ্রুত সুরতহাল প্রতিবেদন তৈরি করা হয়।

মুলাদী থানার ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা (ওসি) আরাফাত জাহান চৌধুরী বুধবার (২৮ জানুয়ারি) রাতে বিষয়টি নিশ্চিত করে গণমাধ্যমকে জানান, "প্রাথমিক তদন্তে আমরা জানতে পেরেছি, মায়ের সাথে অভিমান করেই ওই শিক্ষার্থী আত্মহত্যা করেছে। মুলাদীতে এসএসসি পরীক্ষার্থীর আত্মহত্যার এই ঘটনায় থানায় একটি অপমৃত্যু (UD) মামলা দায়ের করা হয়েছে।"

তিনি আরও জানান, মৃত্যুর সঠিক কারণ শতভাগ নিশ্চিত হওয়ার জন্য মরদেহটি ময়নাতদন্তের জন্য বুধবার সকালেই বরিশাল শের-ই-বাংলা মেডিকেল কলেজ (শেবাচিম) হাসপাতালের মর্গে প্রেরণ করা হয়েছে। ময়নাতদন্তের প্রতিবেদন হাতে পাওয়ার পর মৃত্যুর চিকিৎসা-বৈজ্ঞানিক কারণ জানা যাবে, তবে আপাতত এটি আত্মহত্যা বলেই প্রতীয়মান হচ্ছে। পুলিশ জানিয়েছে, পারিবারিক কলহ বা অন্য কোনো কারণ আছে কি না, সেটিও খতিয়ে দেখা হচ্ছে, যদিও প্রাথমিকভাবে মোবাইল ফোন কেন্দ্রিক অভিমানকেই মুলাদীতে এসএসসি পরীক্ষার্থীর আত্ম-হত্যার মূল কারণ হিসেবে চিহ্নিত করা হয়েছে।

বাবার শোকে মানসিক বিপর্যয় এবং মুলাদীতে এসএসসি পরীক্ষার্থীর আত্ম-হত্যা

এই আত্মহত্যার পেছনে শুধুই কি মোবাইল ফোন নিয়ে শাসন, নাকি লুকিয়ে ছিল গভীর কোনো মানসিক কষ্ট? নিহতের পারিবারিক সূত্রে জানা গেছে, জৈতিমনি মানসিকভাবে কিছুটা বিপর্যস্ত ছিল। তার গ্রামের বাড়ি গোপালগঞ্জ জেলার কোটালীপাড়া উপজেলার নৈয়ারবাড়ী গ্রামে। তার বাবা রিপন রায় কিছুদিন আগেই মারা গেছেন। বাবার মৃত্যু কিশোরী মেয়েটির মনে গভীর ক্ষতের সৃষ্টি করেছিল।

বাবার মৃত্যুর পর থেকেই জৈতিমনি নিজেকে অনেকটা গুটিয়ে নিয়েছিল। সে তার বাবাকে প্রচণ্ড ভালোবাসত। মা ঝুমা সরকার কান্নাজড়িত কণ্ঠে তদন্তকারী কর্মকর্তাদের জানান, বাবার অনুপস্থিতি মেয়েকে মানসিকভাবে ভেঙে ফেলেছিল। প্রায়শই সে বলত, "আমি বাবার কাছে চলে যাব।" বাবার প্রতি এই তীব্র টান এবং মানসিক বিষণ্নতা হয়তো তার মনে দীর্ঘস্থায়ী প্রভাব ফেলেছিল। মনোবিজ্ঞানীদের মতে, প্রিয়জন হারানোর শোক বা 'গ্রিফ' (Grief) সঠিকভাবে কাটিয়ে উঠতে না পারলে কিশোর-কিশোরীরা আত্মঘাতী সিদ্ধান্তের দিকে ঝুঁকতে পারে। মঙ্গলবার রাতের তুচ্ছ ঘটনাটি হয়তো বারুদস্তূপে দেওয়াশলাইয়ের মতো কাজ করেছে, যার ফলে মুলাদীতে এসএসসি পরীক্ষার্থীর আত্ম-হত্যার ঘটনাটি ঘটেছে।

মেধাবী মুখের বিদায় ও শিক্ষা প্রতিষ্ঠানের শোক

জৈতিমনি রায় এবছরের এসএসসি পরীক্ষার্থী ছিল। তার মা ঝুমা সরকার একই বিদ্যালয়ের শিক্ষক হওয়ায় মা ও মেয়ে উভয়েরই পরিচিতি ছিল স্কুলটিতে। সহপাঠী এবং শিক্ষকদের কাছে জৈতিমনি ছিল একজন শান্তশিষ্ট মেয়ে। মুলাদী সরকারি মাহমুদজান মাধ্যমিক বিদ্যালয়ের শিক্ষক ও সহপাঠীরা মুলাদীতে এসএসসি পরীক্ষার্থীর আত্ম-হত্যার খবরে গভীরভাবে শোকাহত।

বিদ্যালয়ের একজন শিক্ষক জানান, "সামনেই তার পরীক্ষা ছিল। আমরা আশা করছিলাম সে ভালো ফলাফল করবে। কিন্তু এভাবে অকালে ঝরে যাবে, তা আমরা কল্পনাও করতে পারিনি।" সহপাঠীরাও তাদের বন্ধুকে হারিয়ে বাকরুদ্ধ। পরীক্ষার ঠিক আগ মুহূর্তে এমন ঘটনা পরীক্ষার্থীদের মনের ওপরও নেতিবাচক প্রভাব ফেলতে পারে বলে আশঙ্কা করছেন অভিভাবকরা। মুলাদীতে এসএসসি পরীক্ষার্থীর আত্মহত্যার এই ঘটনা পুরো শিক্ষা পরিবারকে নাড়িয়ে দিয়েছে।

মুলাদীতে এসএসসি পরীক্ষার্থীর আত্মহত্যা: সামাজিক ও মনস্তাত্ত্বিক বিশ্লেষণ

এই ঘটনাটি আমাদের সমাজে কিশোর-কিশোরীদের মানসিক স্বাস্থ্য এবং অভিভাবকদের সচেতনতার বিষয়টি আবারও সামনে নিয়ে এসেছে। বর্তমান সময়ে ডিজিটাল ডিভাইসের প্রতি আসক্তি এবং তা নিয়ন্ত্রণ করতে গিয়ে অভিভাবকদের সাথে সন্তানদের দূরত্ব তৈরি হওয়া একটি সাধারণ সমস্যায় পরিণত হয়েছে। তবে মুলাদীতে এসএসসি পরীক্ষার্থীর আত্ম-হত্যার ক্ষেত্রে মোবাইল ফোন ছিল কেবল একটি 'ট্রিগার' বা উপলক্ষ মাত্র।

বিশেষজ্ঞরা বলছেন, বয়ঃসন্ধিকালে (Teenage) ছেলেমেয়েরা হরমোনজনিত পরিবর্তনের কারণে খুব বেশি আবেগপ্রবণ থাকে। তাদের যুক্তি দিয়ে বিচার করার ক্ষমতার চেয়ে আবেগের প্রাবল্য বেশি থাকে। জৈতিমনির ক্ষেত্রে বাবার মৃত্যুশোক সেই আবেগকে আরও নাজুক করে তুলেছিল। যেসব শিশু বা কিশোর-কিশোরী পরিবারের কোনো সদস্যকে হারিয়ে ট্রমার মধ্যে আছে, তাদের প্রতি বাড়তি যত্ন নেওয়া জরুরি। তাদের মনের কথা শোনা এবং তাদের একাকীত্ব দূর করার চেষ্টা করা পরিবারের দায়িত্ব।

আজকের এই মুলাদীতে এসএসসি পরীক্ষার্থীর আত্ম-হত্যার ঘটনা থেকে আমাদের শেখার আছে অনেক কিছু:
১. ধৈর্যশীল আচরণ: সন্তানদের শাসন করার ক্ষেত্রে অভিভাবকদের আরও বেশি কৌশলী ও সহনশীল হওয়া প্রয়োজন।
২. মানসিক স্বাস্থ্যের গুরুত্ব: সন্তান চুপচাপ হয়ে গেলে বা অস্বাভাবিক আচরণ করলে (যেমন—মৃত আত্মীয়ের কাছে চলে যাওয়ার কথা বলা) তা গুরুত্বের সাথে নিতে হবে। প্রয়োজনে মনোরোগ বিশেষজ্ঞের পরামর্শ নিতে হবে।
৩. ডিভাইস নিয়ন্ত্রণ: হুট করে হাত থেকে মোবাইল কেড়ে না নিয়ে বা কড়া ভাষায় শাসন না করে, বুঝিয়ে বা সময় নির্ধারণ করে দিয়ে প্রযুক্তির ব্যবহার নিয়ন্ত্রণ করা উচিত।

শেষযাত্রায় জৈতিমনি

আইনগত প্রক্রিয়া ও ময়নাতদন্ত শেষে জৈতিমনির মরদেহ পরিবারের কাছে হস্তান্তর করা হয়েছে। স্বজনদের আহাজারিতে হাসপাতাল মর্গ এবং বাড়ির পরিবেশ ভারী হয়ে ওঠে। গোপালগঞ্জের কোটালীপাড়ায় তাদের গ্রামের বাড়িতে ধর্মীয় রীতি অনুযায়ী শেষকৃত্য সম্পন্ন হওয়ার কথা রয়েছে। বাবার কাছে যাওয়ার জন্য যে আকুতি জৈতিমনির মনে ছিল, তা তাকে সত্যি সত্যিই না ফেরার দেশে নিয়ে গেল। কিন্তু রেখে গেল এক বুক হাহাকার।

মুলাদীতে এসএসসি পরীক্ষার্থীর আত্ম-হত্যার এই ঘটনাটি নিছক একটি সংবাদ নয়, এটি প্রতিটি পরিবারের জন্য একটি সতর্কবার্তা। পরীক্ষার জিপিএ-৫ বা ভালো ফলাফলের চেয়েও সন্তানের মানসিক সুস্থতা এবং জীবন যে অনেক বেশি মূল্যবান, তা যেন আমরা ভুলে না যাই। আমরা এই কিশোরীর আত্মার শান্তি কামনা করছি এবং শোকসন্তপ্ত মা ঝুমা সরকার ও তার পরিবারের প্রতি গভীর সমবেদনা জানাচ্ছি। এমন মৃত্যু যেন আর কোনো মায়ের কোল খালি না করে, সেটাই আজ সবার কাম্য।

Comments