 |
| টানা তিন কার্যদিবস ধরে আস্থা সংকটে পুঁজিবাজার দরপতন অব্যাহত। |
নিজস্ব প্রতিবেদক | ঢাকা
দেশের অর্থনীতির অন্যতম প্রধান খাত পুঁজিবাজারে আবারও অস্থিরতার কালো মেঘ দেখা দিয়েছে। আশার আলো দেখিয়েও ঘুরে দাঁড়াতে পারছে না দেশের শেয়ারবাজার। উল্টো টানা তিন কার্যদিবসের পতনে নতুন করে হতাশায় নিমজ্জিত হয়েছেন সাধারণ বিনিয়োগকারীরা। সপ্তাহের প্রথম কার্যদিবসেও সূচকের বড় পতনের মধ্য দিয়ে লেনদেন শেষ হয়েছে। বাজার সংশ্লিষ্টরা বলছেন, মূলত আস্থা সংকটে পুঁজিবাজার দরপতন এর বৃত্ত থেকে বের হতে পারছে না, যা অর্থনীতির জন্য অশনিসংকেত।
গত ৫ আগস্টের রাজনৈতিক পটপরিবর্তনের পর বিনিয়োগকারীরা নতুন করে স্বপ্ন দেখতে শুরু করেছিলেন। কিন্তু সেই স্বপ্নের বাস্তবায়ন তো দূরের কথা, উল্টো পুঁজি হারিয়ে দিশেহারা হয়ে পড়ছেন অনেকে। ফলে আস্থাহীনতার কারণে বাজার থেকে হাত গুটিয়ে নিচ্ছেন বিনিয়োগকারীরা, যার নেতিবাচক প্রভাব হিসেবে আমরা দেখছি টানা আস্থা সংকটে পুঁজিবাজার দরপতন।
আস্থা সংকটে পুঁজিবাজার দরপতন ও নিয়ন্ত্রক সংস্থার ভূমিকা
দেশের রাজনৈতিক দৃশ্যপটে বড় পরিবর্তনের পর রাষ্ট্রযন্ত্রের প্রায় সব ক্ষেত্রেই সংস্কারের ছোঁয়া লাগে। এর ব্যতিক্রম ছিল না পুঁজিবাজারের নিয়ন্ত্রক সংস্থা বাংলাদেশ সিকিউরিটিজ অ্যান্ড এক্সচেঞ্জ কমিশন (বিএসইসি)। গত ১৮ আগস্ট খন্দকার রাশেদ মাকসুদের নেতৃত্বে নতুন কমিশন দায়িত্ব গ্রহণ করে। দায়িত্ব নেওয়ার পর থেকেই নতুন কমিশন বাজারে স্বচ্ছতা ফেরাতে এবং কারসাজি রোধে কঠোর অবস্থান গ্রহণ করে।
গত দেড় মাসে বেশ কিছু অনিয়মের বিরুদ্ধে কঠোর ব্যবস্থা নিয়েছে বিএসইসি। বিভিন্ন ব্যক্তি ও প্রতিষ্ঠানকে করা হয়েছে হাজার কোটি টাকা জরিমানা। নিয়ন্ত্রক সংস্থার এমন কঠোর অবস্থানকে সাধারণ বিনিয়োগকারীরা প্রথমে স্বাগত জানালেও, আদতে বাজারে এর সুফল মিলছে না। বরং কঠোর তদারকির ভয়ে বাজারের বড় বিনিয়োগকারীরা সাইডলাইনে চলে গেছেন বলে মনে করছেন সংশ্লিষ্টরা। ফলে বাজারে তারল্য সংকট দেখা দিয়েছে এবং লেনদেন নেমে এসেছে তলানিতে। বিনিয়োগকারীদের অভিযোগ, কারসাজি রোধে কমিশন তৎপর হলেও বাজারের স্বাভাবিক গতি ফেরাতে তারা সফল হননি, যার ফলস্বরূপ এই আস্থা সংকটে পুঁজিবাজার দরপতন।
আইপিও খরা ও ভালো শেয়ারের অভাব
পুঁজিবাজারের প্রাণ হলো নতুন এবং ভালো মৌলভিত্তিক কোম্পানি। কিন্তু দুর্ভাগ্যজনকভাবে গত ১৮ মাসে দেশের পুঁজিবাজারে একটিও ইনিশিয়াল পাবলিক অফারিং বা আইপিও আসেনি। নতুন কমিশন দায়িত্ব নেওয়ার পরও এই খরা কাটেনি।
বাজার সংশ্লিষ্টরা বলছেন, বিনিয়োগকারীদের আগ্রহ ধরে রাখতে হলে এবং নতুন মূলধন সংগ্রহের পথ সুগম করতে হলে বাজারে ভালো মানের কোম্পানির তালিকাভুক্তি এখন সময়ের দাবি। দীর্ঘ সময় ধরে নতুন কোনো ভালো কোম্পানি বাজারে না আসায় বিনিয়োগকারীদের মধ্যে একঘেয়েমি ও হতাশা তৈরি হয়েছে। সেকেন্ডারি মার্কেটে লেনদেনের পাশাপাশি প্রাইমারি মার্কেটের স্থবিরতাও আস্থা সংকটে পুঁজিবাজার দরপতন এর পেছনের অন্যতম কারণ হিসেবে কাজ করছে।
ডিএসইর লেনদেনে আস্থা সংকটে পুঁজিবাজার দরপতন এর চিত্র
সপ্তাহের প্রথম কার্যদিবসে ঢাকা স্টক এক্সচেঞ্জে (ডিএসই) লেনদেনের চিত্র ছিল বেশ হতাশাজনক। গত সপ্তাহে বাজার কিছুটা ইতিবাচক ধারায় ফিরলেও, তা স্থায়ী হয়নি। টানা তিন কার্যদিবস পতনের বৃত্তেই আটকে রইল সূচক।
ডিএসই সূত্রে প্রাপ্ত তথ্যমতে, রোববার দিনশেষে ডিএসইর প্রধান সূচক বা ‘ডিএসই ব্রড ইনডেক্স’ (DSEX) আগের দিনের চেয়ে ২৭ পয়েন্ট কমে ৫ হাজার ৭২ পয়েন্টে অবস্থান করছে। শরিয়াহভিত্তিক কোম্পানিগুলোর সূচক ‘ডিএসই শরিয়াহ’ (DSES) ৭ পয়েন্ট কমে ১ হাজার ১৭ পয়েন্টে এবং ব্লু-চিপ কোম্পানিগুলোর সূচক ‘ডিএসই-৩০’ ১৫ পয়েন্ট কমে ১ হাজার ৯৪৭ পয়েন্টে দাঁড়িয়েছে। সূচকের এই নিম্নমুখী আচরণ স্পষ্ট করে দেয় যে, আস্থা সংকটে পুঁজিবাজার দরপতন কতটা তীব্র আকার ধারণ করেছে।
শুধু সূচক নয়, লেনদেনের পরিমাণও কমেছে আশঙ্কাজনক হারে। এদিন ডিএসইতে মোট ৫২৬ কোটি ৫০ লাখ টাকার লেনদেন হয়েছে। যা আগের কার্যদিবসের (৫৩৬ কোটি ১২ লাখ টাকা) তুলনায় ৯ কোটি ৬২ লাখ টাকা কম।
বাজারের গভীরতা বিশ্লেষণ করলে দেখা যায়, দিনভর লেনদেন হওয়া ৩৯২টি কোম্পানি ও মিউচ্যুয়াল ফান্ডের মধ্যে সিংহভাগ প্রতিষ্ঠানের শেয়ারদর কমেছে। এর মধ্যে দর বেড়েছে ১০৭টির, কমেছে ২২৫টির এবং অপরিবর্তিত রয়েছে ৬০টি কোম্পানির শেয়ারদর। বেশিরভাগ কোম্পানির শেয়ারের দাম কমার কারণে বিনিয়োগকারীদের পোর্টফোলিওতে বড় ধরনের লোকসানের ছাপ পড়েছে। মূলত ক্রেতার অভাবে এবং আস্থা সংকটে পুঁজিবাজার দরপতন ঠেকানো সম্ভব হচ্ছে না।
বিশ্লেষকদের মতামত: কেন এই দরপতন?
টানা তিন দিনের এই পতনকে এখনই ‘মহাবিপর্যয়’ বলতে নারাজ বাজার বিশ্লেষকরা। তাদের মতে, গত সপ্তাহে তিন কার্যদিবস সূচকের যে উত্থান হয়েছিল, এখনকার পতনটি মূলত তারই একটি ‘সংশোধন’ বা ‘প্রফিট টেকিং’ (Profit Taking)।
বিশ্লেষকরা বলছেন, সপ্তাহের শুরুতে বিভিন্ন খাতের শেয়ারের দাম কিছুটা বাড়লে বিনিয়োগকারীদের একটি অংশ মুনাফা তুলে নেওয়ার চেষ্টা করেন। এ মুহূর্তে বাজারে ক্রেতার চেয়ে বিক্রেতার সংখ্যা বেশি। তবে ইতিবাচক দিক হলো, বাজার এখনও বড় ধরনের বিক্রয়চাপ বা ‘সেলিং প্রেসার’ (Selling Pressure) থেকে মুক্ত রয়েছে।
তবে বিশ্লেষকরা সতর্ক করে দিয়ে বলেছেন, এ মুহূর্তে বাজারে আতঙ্ক ছড়িয়ে অতিরিক্ত বিক্রয়চাপ তৈরি করা ঠিক হবে না। কারণ পুঁজিবাজার এখনও পুরোপুরি তার নিজস্ব শক্তি ফিরে পায়নি। কোনো কারণে যদি প্যানিক সেল বা বিক্রয়চাপ বেড়ে যায়, তবে বাজারে অস্বস্তি ফিরে আসবে। তখন আস্থা সংকটে পুঁজিবাজার দরপতন আরও দীর্ঘায়িত হতে পারে। তাদের প্রত্যাশা, বিনিয়োগকারীরা ধৈর্য ধরলে বাজার যেকোনো সময় ঘুরে দাঁড়াতে পারে।
চট্টগ্রাম স্টক এক্সচেঞ্জের (সিএসই) পরিস্থিতি
দেশের অপর পুঁজিবাজার চট্টগ্রাম স্টক এক্সচেঞ্জেও (সিএসই) একই চিত্র দেখা গেছে। রোববার সিএসইর সার্বিক সূচক ‘সিএএসপিআই’ (CASPI) ১৩ পয়েন্ট কমে ১৪ হাজার ২৪৭ পয়েন্টে দাঁড়িয়েছে।
এদিন সিএসইতে লেনদেনে অংশ নেওয়া ১৫৪টি কোম্পানির মধ্যে দর বেড়েছে ৬৬টির, কমেছে ৭১টির এবং অপরিবর্তিত রয়েছে ১৭টি কোম্পানির শেয়ারদর। দিনভর এখানে ৯ কোটি ২৭ লাখ টাকার শেয়ার ও ইউনিট লেনদেন হয়েছে। সিএসইর এই চিত্রও প্রমাণ করে যে, আস্থা সংকটে পুঁজিবাজার দরপতন শুধু ঢাকায় নয়, সারাদেশের বিনিয়োগকারীদের মধ্যেই ছড়িয়ে পড়েছে।
আগামীর ভাবনা ও প্রত্যাশা
পুঁজিবাজার অর্থনীতির দর্পণ। এই দর্পণ এখন কিছুটা ঘোলাটে। একদিকে নিয়ন্ত্রক সংস্থার কঠোর অবস্থান, অন্যদিকে বিনিয়োগকারীদের আস্থাহীনতা—এই দুইয়ের যাঁতাকলে পিষ্ট হচ্ছে বাজার। বিশেষজ্ঞরা মনে করছেন, শুধু জরিমানা বা শাস্তিমূলক ব্যবস্থা দিয়ে বাজারের স্বাভাবিক গতি ফেরানো সম্ভব নয়। এর জন্য প্রয়োজন পলিসি সাপোর্ট এবং বিনিয়োগকারীদের মনে সাহস সঞ্চার করা।
অর্থনীতির এই প্রধান খাতটিতে স্থিতিশীলতা ফেরাতে হলে ভালো মৌলভিত্তিক কোম্পানিকে বাজারে আনতে হবে। একইসঙ্গে নিয়ন্ত্রক সংস্থাকে বিনিয়োগবান্ধব পরিবেশ নিশ্চিত করতে আরও দৃশ্যমান ও কার্যকর পদক্ষেপ নিতে হবে। বিনিয়োগকারীরা এখন তাকিয়ে আছেন আগামী দিনের লেনদেনের দিকে। তারা প্রত্যাশা করছেন, আস্থা সংকটে পুঁজিবাজার দরপতন এর এই নেতিবাচক ধারা কাটিয়ে দেশের পুঁজিবাজার অচিরেই একটি শক্তিশালী ভিত্তির ওপর দাঁড়াবে এবং অর্থনীতির চাকা সচল রাখতে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করবে। অন্যথায়, সাধারণ বিনিয়োগকারীরা বাজারবিমুখ হলে তা জাতীয় অর্থনীতির জন্য বড় ক্ষতির কারণ হয়ে দাঁড়াতে পারে।
Comments
Post a Comment