 |
| পুঁজিবাজারে বিনিয়োগকারীদের আস্থা সংকট এবং শেয়ার বাজারে সূচকের বড় পতন। |
পুঁজিবাজারে বিনিয়োগকারীদের আস্থা সংকট বর্তমানে চরমে পৌঁছেছে, যার প্রতিফলন দেখা যাচ্ছে সপ্তাহের প্রথম কার্যদিবসেই। দেশের প্রধান শেয়ারবাজার ঢাকা স্টক এক্সচেঞ্জে (ডিএসই) সূচকের বড় ধরনের পতনে লেনদেন শেষ হওয়ায় সাধারণ বিনিয়োগকারীদের মধ্যে নতুন করে আতঙ্ক ছড়িয়ে পড়েছে। দীর্ঘদিন ধরে মন্দাভাবের পর যখন বাজার কিছুটা ঘুরে দাঁড়ানোর স্বপ্ন দেখাচ্ছিল, ঠিক তখনই ব্যাংকসহ শীর্ষ মূলধনী কোম্পানিগুলোর শেয়ারের দাম অস্বাভাবিকভাবে কমে যাওয়ায় পুরো বাজার ব্যবস্থা এক অনিশ্চয়তার মুখে পড়েছে।
পুঁজিবাজারে বিনিয়োগকারীদের আস্থা সংকট ও বর্তমান পরিস্থিতি
সপ্তাহের প্রথম দিনেই লেনদেনের শুরুতে বাজার কিছুটা স্বাভাবিক থাকলেও সময়ের সাথে সাথে বিক্রয়চাপ বাড়তে থাকে। বিশেষ করে বড় মূলধনী কোম্পানিগুলোর শেয়ার বিক্রির ধুম পড়লে সূচকে বড় পতন ঘটে। বিনিয়োগকারীরা বলছেন, বাজার আজ ভালো তো কাল খারাপ—এই পরিস্থিতির কারণে তারা কোনোভাবেই দীর্ঘমেয়াদী পরিকল্পনা করতে পারছেন না। বছরের পর বছর পার হয়ে গেলেও একটি স্থিতিশীল পুঁজিবাজারের দেখা মিলছে না। ফলে পুঁজিবাজারে বিনিয়োগকারীদের আস্থা সংকট এখন এমন পর্যায়ে পৌঁছেছে যে, ক্ষুদ্র বিনিয়োগকারীরা তাদের পুঁজি রক্ষায় বাজার থেকে মুখ ফিরিয়ে নেওয়ার কথা ভাবছেন।
সামষ্টিক অর্থনীতির তীব্র চাপ, রাজনৈতিক অস্থিতিশীলতা এবং সুশাসনের অভাব সম্মিলিতভাবে বাজারকে অপরিণত ও অস্থিতিশীল করে তুলেছে। বিশেষ করে আগামী ১২ ফেব্রুয়ারি ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচনকে সামনে রেখে যেখানে বাজার চাঙা হওয়ার কথা, সেখানে উল্টো দরপতন বিনিয়োগকারীদের মনে হাজারো প্রশ্নের জন্ম দিয়েছে। এই অবস্থায় যদি নিয়ন্ত্রক সংস্থা বিএসইসি দ্রুত কোনো দৃশ্যমান পদক্ষেপ না নেয়, তবে দেশের অর্থনীতির অন্যতম চালিকাশক্তি এই পুঁজিবাজার বড় ধরনের বিপর্যয়ের সম্মুখীন হতে পারে।
বিশেষজ্ঞের চোখে পুঁজিবাজারে বিনিয়োগকারীদের আস্থা সংকট
দেশের পুঁজিবাজারের এই নাজুক অবস্থা নিয়ে গভীর উদ্বেগ প্রকাশ করেছেন সাবেক তত্ত্বাবধায়ক সরকারের অর্থ উপদেষ্টা ও বিশিষ্ট অর্থনীতিবিদ ড. এবি মির্জ্জা আজিজুল ইসলাম। তিনি মনে করেন, বর্তমানে বাজারের মূল অন্তরায় হচ্ছে পুঁজিবাজারে বিনিয়োগকারীদের আস্থা সংকট। টানা দরপতনের ফলে অধিকাংশ বিনিয়োগকারী এরই মধ্যে তাদের মূলধনের বড় অংশ হারিয়ে ফেলেছেন। যখন কোনো বিনিয়োগকারী ক্রমাগত লোকসানের মুখে পড়েন, তখন তার পক্ষে বাজারের ওপর বিশ্বাস রাখা কঠিন হয়ে পড়ে।
ড. আজিজুল ইসলাম আরও বলেন, “বাজারের এই অস্থিরতা কাটাতে হলে সবার আগে সুশাসন নিশ্চিত করতে হবে। যারা কারসাজির মাধ্যমে সাধারণ মানুষের টাকা হাতিয়ে নিচ্ছে, তাদের আইনের আওতায় এনে বিচার করতে হবে। বিনিয়োগকারীদের এই মর্মে নিশ্চয়তা দিতে হবে যে, তাদের বিনিয়োগ নিরাপদ। ভালো মৌলভিত্তিসম্পন্ন শেয়ারের সরবরাহ না বাড়লে এবং পুঁজিবাজারে বিনিয়োগকারীদের আস্থা সংকট দূর না হলে দীর্ঘমেয়াদে বাজারকে টেকসই করা সম্ভব নয়।”
সূচক ও লেনদেনের বিস্তারিত চিত্র
বাজার পর্যবেক্ষণে দেখা গেছে, দিনশেষে ডিএসই ব্রড ইনডেক্স আগের দিনের চেয়ে ৫৮ পয়েন্ট কমে ৪ হাজার ৯৩৯ পয়েন্টে অবস্থান করছে। একইভাবে ডিএসই শরিয়াহ সূচক ১১ পয়েন্ট কমে ৯৯৮ পয়েন্টে এবং ডিএসই-৩০ সূচক ১৮ পয়েন্ট কমে ১ হাজার ৮৯৬ পয়েন্টে দাঁড়িয়েছে। দিনভর লেনদেন হওয়া ৩৯২টি কোম্পানি ও মিউচ্যুয়াল ফান্ডের মধ্যে মাত্র ৩৮টির দাম বেড়েছে, যেখানে ৩১৩টির দাম কমেছে এবং ৪১টির দর অপরিবর্তিত রয়েছে। অর্থাৎ বাজারের প্রায় ৮০ শতাংশ কোম্পানির শেয়ার দর আজ হ্রাস পেয়েছে।
টাকার অংকে লেনদেনের পরিমাণও আশঙ্কাজনকভাবে কমেছে। ডিএসইতে আজ ৪১২ কোটি ২৮ লাখ টাকার শেয়ার লেনদেন হয়েছে, যা আগের কার্যদিবসের চেয়ে ৬ কোটি ২৭ লাখ টাকা কম। লেনদেনের এই নিম্নগতি প্রমাণ করে যে, পুঁজিবাজারে বিনিয়োগকারীদের আস্থা সংকট কতটা প্রকট। বিনিয়োগকারীরা নতুন করে টাকা বিনিয়োগ করতে ভয় পাচ্ছেন এবং যারা বাজারে আছেন, তারাও শেয়ার বিক্রি করে হাত গুটিয়ে নিচ্ছেন।
চট্টগ্রাম স্টক এক্সচেঞ্জের অবস্থা
দেশের দ্বিতীয় প্রধান বাজার চট্টগ্রাম স্টক এক্সচেঞ্জেও (সিএসই) একই চিত্র লক্ষ্য করা গেছে। সিএসইর সার্বিক সূচক সিএএসপিআই ১১৬ পয়েন্ট কমে ১৩ হাজার ৮৭৭ পয়েন্টে দাঁড়িয়েছে। সিএসইতে লেনদেনে অংশ নেওয়া ১৫৪টি কোম্পানির মধ্যে মাত্র ৪১টির দাম বেড়েছে, যেখানে ৯২টির দাম কমেছে এবং ২১টির দর অপরিবর্তিত রয়েছে। সিএসইতে মাত্র ৪ কোটি ৩ লাখ টাকার শেয়ার ও ইউনিট লেনদেন হয়েছে, যা অত্যন্ত নগণ্য। মূলত সারা দেশেই পুঁজিবাজারে বিনিয়োগকারীদের আস্থা সংকট ছড়িয়ে পড়ার কারণেই লেনদেনের এই খরা দেখা দিয়েছে।
আস্থা ফেরাতে বিএসইসির করণীয়
বাজার সংশ্লিষ্টরা মনে করেন, পুঁজিবাজারকে ধ্বংসের হাত থেকে বাঁচাতে হলে বিএসইসিকে (বাংলাদেশ সিকিউরিটিজ অ্যান্ড এক্সচেঞ্জ কমিশন) এখনই হার্ডলাইনে যেতে হবে। কেবল আশ্বাস দিয়ে পুঁজিবাজারে বিনিয়োগকারীদের আস্থা সংকট দূর করা সম্ভব নয়। এজন্য প্রয়োজন কার্যকর নীতিমালা এবং তার সঠিক বাস্তবায়ন।
১. কারসাজি রোধ: যারা কৃত্রিমভাবে শেয়ারের দাম কমিয়ে বা বাড়িয়ে সাধারণ বিনিয়োগকারীদের বিপদে ফেলছে, তাদের চিহ্নিত করে দৃষ্টান্তমূলক শাস্তি দিতে হবে।
২. ভালো শেয়ারের জোগান: বাজারে বহুজাতিক ও লাভজনক সরকারি কোম্পানিগুলোর শেয়ার তালিকাভুক্ত করতে হবে।
৩. প্রাতিষ্ঠানিক বিনিয়োগকারীদের সক্রিয় করা: সাধারণ বিনিয়োগকারীদের একা ফেলে প্রাতিষ্ঠানিক বিনিয়োগকারীরা যেন নিষ্ক্রিয় না থাকে, তা নিশ্চিত করতে হবে।
৪. স্বচ্ছতা ও জবাবদিহিতা: তালিকাভুক্ত কোম্পানিগুলোর আর্থিক প্রতিবেদনে স্বচ্ছতা বজায় রাখা এবং বিনিয়োগকারীদের স্বার্থ রক্ষা করা বিএসইসির প্রধান দায়িত্ব হওয়া উচিত।
বিনিয়োগকারীদের আতঙ্ক ও অর্থনীতির ঝুঁকি
পুঁজিবাজার কেবল কয়েক লাখ বিনিয়োগকারীর ভাগ্য নয়, বরং এটি দেশের সামগ্রিক অর্থনীতির আয়না। যখন পুঁজিবাজারে বিনিয়োগকারীদের আস্থা সংকট তৈরি হয়, তখন দেশের ব্যবসা-বাণিজ্যেও তার নেতিবাচক প্রভাব পড়ে। শিল্পায়নের জন্য দীর্ঘমেয়াদী অর্থের জোগান আসে এই বাজার থেকে। কিন্তু বাজার যদি নিজেই ধুঁকতে থাকে, তবে উদ্যোক্তারা নতুন বিনিয়োগে উৎসাহিত হবেন না।
সাধারণ বিনিয়োগকারীরা হাহাকার করছেন কারণ তাদের অনেকেরই সংসার চলে এই বাজারের আয়ের ওপর। হঠাৎ বড় দরপতনে তারা দিশেহারা হয়ে পড়েছেন। সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমগুলোতেও বিনিয়োগকারীদের ক্ষোভ লক্ষ্য করা যাচ্ছে। তারা মনে করছেন, নিয়ন্ত্রক সংস্থা বাজারের শৃঙ্খলা ফেরাতে ব্যর্থ হচ্ছে, যার ফলে পুঁজিবাজারে বিনিয়োগকারীদের আস্থা সংকট দিন দিন আরও ঘনীভূত হচ্ছে।
শেষকথা
পরিশেষে বলা যায়, পুঁজিবাজারকে খাদের কিনারা থেকে টেনে তুলতে হলে বিএসইসি, সরকার এবং সকল স্টেকহোল্ডারদের একযোগে কাজ করতে হবে। নির্বাচনী বছরে বাজারের এই অস্থিরতা কোনোভাবেই কাম্য নয়। বিনিয়োগকারীরা চান একটি স্থিতিশীল বাজার, যেখানে তারা নিশ্চিন্তে বিনিয়োগ করতে পারবেন। পুঁজিবাজারে বিনিয়োগকারীদের আস্থা সংকট দূর করতে না পারলে অদূর ভবিষ্যতে দেশের অর্থনীতি এক বড় ধরনের ঝুঁকির মুখে পড়বে। তাই সময় থাকতেই কঠোর আইনি ব্যবস্থা এবং সুশাসন নিশ্চিত করার মাধ্যমে বাজারকে স্বাভাবিক অবস্থায় ফিরিয়ে আনা এখন সময়ের দাবি। বাজারের প্রতি সাধারণ মানুষের বিশ্বাস ফিরিয়ে আনাই হোক বিএসইসির বর্তমান সময়ের প্রধান চ্যালেঞ্জ।
Comments
Post a Comment