 |
| সপ্তাহের শেষ কার্যদিবসে সূচকের পতন |
পুঁজিবাজারে বিনিয়োগকারীদের আস্থা সংকট বর্তমানে দেশের শেয়ারবাজারের উন্নয়নের পথে প্রধান অন্তরায় হয়ে দাঁড়িয়েছে। সপ্তাহের শেষ কার্যদিবসে ঢাকা স্টক এক্সচেঞ্জে (ডিএসই) সূচকের যে মিশ্র প্রবণতা দেখা গেছে, তা বিনিয়োগকারীদের মনে নতুন করে সংশয় তৈরি করেছে। মূলত দুই কার্যদিবস সূচকের নামমাত্র উত্থান হলেও শেষ পর্যন্ত তা স্থায়িত্ব পায়নি। বিশেষ করে বিমা খাতের শেয়ারগুলোর বড় ধরনের দরপতন সামগ্রিক বাজারকে নেতিবাচক দিকে ঠেলে দিয়েছে।
বিমা খাতের ধস ও পুঁজিবাজারে বিনিয়োগকারীদের আস্থা সংকট
পুঁজিবাজারের সাম্প্রতিক চিত্র বিশ্লেষণ করলে দেখা যায়, বিমা খাতের শেয়ারগুলো নিয়ে বিনিয়োগকারীদের মধ্যে এক ধরণের সাময়িক উদ্দীপনা তৈরি হয়েছিল। টানা দুই কার্যদিবস এই খাতের শেয়ারগুলোর দাম বাড়লেও সপ্তাহের শেষ দিনে এসে চিত্র সম্পূর্ণ উল্টো হয়ে যায়। বিমা কোম্পানিগুলোর শেয়ারের ঢালাও দরপতন বাজারকে অস্থিতিশীল করে তুলেছে। বাজার সংশ্লিষ্টরা মনে করছেন, পুঁজিবাজারে বিনিয়োগকারীদের আস্থা সংকট প্রকট হওয়ায় বিনিয়োগকারীরা মুনাফা তুলে নেওয়ার চাপে ছিলেন, যার ফলে শেয়ারের দাম ধরে রাখা সম্ভব হয়নি। এই অস্থিরতা শুধু বিমা খাতেই সীমাবদ্ধ থাকেনি, বরং এর প্রভাব ছড়িয়ে পড়েছে অন্যান্য গুরুত্বপূর্ণ খাতেও।
আর্থিক খাতের নেতিবাচক খবর ও বর্তমান পরিস্থিতি
বাজারে বর্তমানে ক্রেতা সংকট এমন পর্যায়ে পৌঁছেছে যে, লেনদেনের পরিমাণ আশঙ্কাজনকভাবে কমে গেছে। এর পেছনে কাজ করছে কিছু নেতিবাচক প্রচারণা ও খবর। বিশেষ করে পাঁচটি ব্যাংক শেয়ার শূন্য ঘোষণা এবং ৯টি আর্থিক খাতের শেয়ারের তালিকাচ্যুতির (Delisting) খবর বিনিয়োগকারীদের মধ্যে বড় ধরণের আতঙ্ক সৃষ্টি করেছে। যখনই কোনো কোম্পানি বা ব্যাংক নিয়ে এধরণের খবর আসে, তখনই পুঁজিবাজারে বিনিয়োগকারীদের আস্থা সংকট আরও ঘনীভূত হয়। এর ফলে প্রতিদিন অনেক কোম্পানি ক্রেতাশূন্য অবস্থায় পড়ে থাকছে, যা লেনদেনের গতিকে মন্থর করে দিচ্ছে।
ডিএসইর বাজার পরিসংখ্যান ও সূচকের অবস্থান
ঢাকা স্টক এক্সচেঞ্জ (ডিএসই) থেকে প্রাপ্ত তথ্য অনুযায়ী, সপ্তাহের শেষ কার্যদিবসে ডিএসই ব্রড ইনডেক্স (DSEX) আগের দিনের তুলনায় ৭ পয়েন্ট কমে ৪ হাজার ৯৫৮ পয়েন্টে দাঁড়িয়েছে। ডিএসই শরিয়াহ সূচক ১ পয়েন্ট কমে অবস্থান করছে ৯৯৫ পয়েন্টে। তবে ডিএসই-৩০ সূচক কিছুটা ইতিবাচক ছিল এবং ৪ পয়েন্ট বেড়ে ১ হাজার ৯১২ পয়েন্টে অবস্থান করছে।
পুঁজিবাজারে বিনিয়োগকারীদের আস্থা সংকট থাকা সত্ত্বেও শেষ দিনে লেনদেনের পরিমাণ সামান্য বেড়েছে। দিনশেষে ডিএসইতে ৩৭৯ কোটি ৮০ লাখ টাকার শেয়ার লেনদেন হয়েছে, যা আগের দিনের চেয়ে ১০ কোটি ১৩ লাখ টাকা বেশি। তবে ৩৯০টি কোম্পানি ও মিউচ্যুয়াল ফান্ডের মধ্যে দর বেড়েছে মাত্র ১০২টির, কমেছে ২২০টির এবং অপরিবর্তিত ছিল ৬৮টির দর। এই পরিসংখ্যানই প্রমাণ করে যে বাজার বর্তমানে কতটা নড়বড়ে অবস্থায় রয়েছে।
সিএসইর বাজারের অবস্থা ও প্রবণতা
চট্টগ্রাম স্টক এক্সচেঞ্জে (সিএসই) সার্বিক সূচক সিএএসপিআই (CASPI) ৫ পয়েন্ট বেড়ে ১৩ হাজার ৯২১ পয়েন্টে অবস্থান করছে। সেখানে ১৫৮টি কোম্পানির শেয়ার লেনদেন হয়েছে, যার মধ্যে ৬৫টির দর বেড়েছে এবং ৬৯টির দর কমেছে। ২৪টি কোম্পানির শেয়ার দর অপরিবর্তিত ছিল। সিএসইতে মোট ৬ কোটি ৭২ লাখ টাকার শেয়ার ও ইউনিট লেনদেন হয়েছে। যদিও সূচক সামান্য বেড়েছে, তবে বিনিয়োগকারীদের মধ্যে উদ্দীপনার অভাব ছিল স্পষ্ট। মূলত পুঁজিবাজারে বিনিয়োগকারীদের আস্থা সংকট সিএসইর লেনদেনেও বড় প্রভাব ফেলেছে।
পুঁজিবাজারে বিনিয়োগকারীদের আস্থা সংকট নিরসনে চ্যালেঞ্জ
বাজার বিশ্লেষকদের মতে, শেয়ারবাজারকে স্থিতিশীল করতে হলে আগে বিনিয়োগকারীদের মনে বিশ্বাস ফিরিয়ে আনতে হবে। বর্তমানে মুদ্রাস্ফীতি, ডলার সংকট এবং বৈশ্বিক অর্থনীতির অস্থিরতার প্রভাবে দেশের শিল্পখাত চাপের মুখে রয়েছে। এর সরাসরি প্রভাব পড়ছে তালিকাভুক্ত কোম্পানিগুলোর আয়ের ওপর। যখন কোম্পানিগুলো কাঙ্ক্ষিত লভ্যাংশ দিতে ব্যর্থ হয়, তখন পুঁজিবাজারে বিনিয়োগকারীদের আস্থা সংকট আরও বৃদ্ধি পায়।
পাশাপাশি, কারসাজি চক্রের তৎপরতা এবং দুর্বল মৌলভিত্তির কোম্পানির শেয়ার নিয়ে অনাকাঙ্ক্ষিত জল্পনা-কল্পনা সাধারণ বিনিয়োগকারীদের লোকসানের মুখে ফেলছে। নিয়ন্ত্রক সংস্থা বিএসইসি (BSEC) বিভিন্ন সময় কঠোর পদক্ষেপের কথা বললেও মাঠ পর্যায়ে তার প্রতিফলন খুব একটা দেখা যাচ্ছে না বলে মনে করেন অনেক বিনিয়োগকারী।
ক্রেতা শূন্যতা ও লেনদেন খরা: একটি গভীর বিশ্লেষণ
পুঁজিবাজারে যখন কোনো শেয়ারের ক্রেতা থাকে না, তখন বুঝতে হবে বিনিয়োগকারীরা বাজার থেকে মুখ ফিরিয়ে নিচ্ছেন। বর্তমানে অনেক মৌলভিত্তি সম্পন্ন শেয়ারের দর সর্বনিম্ন পর্যায়ে থাকলেও ক্রেতা পাওয়া যাচ্ছে না। এই পরিস্থিতি পুঁজিবাজারে বিনিয়োগকারীদের আস্থা সংকট এর চূড়ান্ত বহিঃপ্রকাশ। বিশেষ করে আর্থিক খাতের কোম্পানিগুলোর তালিকাচ্যুতির খবর বিনিয়োগকারীদের মনে এমন একটি ভয় তৈরি করেছে যে, তারা এখন দীর্ঘমেয়াদী বিনিয়োগের চেয়ে সাইডলাইনে বসে থাকাকেই নিরাপদ মনে করছেন।
গুগল এবং বিভিন্ন অর্থনৈতিক বিশ্লেষণী পোর্টাল থেকে পাওয়া তথ্য অনুযায়ী, দেশের সামষ্টিক অর্থনীতির সূচকগুলো স্থিতিশীল না হওয়া পর্যন্ত পুঁজিবাজারে বড় ধরণের জোয়ার আসা কঠিন। ব্যাংকিং খাতের তারল্য সংকট এবং খেলাপি ঋণের উচ্চ হার পুঁজিবাজারের ওপর এক ধরণের অদৃশ্য চাপ সৃষ্টি করে রেখেছে।
বাজার পুনরুদ্ধারে করণীয় ও সুপারিশ
পুঁজিবাজারে বিনিয়োগকারীদের আস্থা সংকট দূর করতে হলে নিচের পদক্ষেপগুলো নেওয়া জরুরি বলে মনে করছেন বিশেষজ্ঞরা:
১. স্বচ্ছতা ও জবাবদিহিতা: তালিকাভুক্ত কোম্পানিগুলোর আর্থিক প্রতিবেদনে স্বচ্ছতা নিশ্চিত করতে হবে। কোনো কোম্পানি তথ্য গোপন করলে বা বিনিয়োগকারীদের বিভ্রান্ত করলে কঠোর শাস্তি নিশ্চিত করতে হবে।
২. গুজব প্রতিরোধ: ব্যাংক বা আর্থিক খাতের তালিকাচ্যুতির মতো সংবেদনশীল খবর নিয়ে যদি কোনো গুজব ছড়ায়, তবে নিয়ন্ত্রক সংস্থাকে দ্রুত স্পষ্টীকরণ করতে হবে।
৩. প্রাতিষ্ঠানিক বিনিয়োগ বৃদ্ধি: বাজারকে সাপোর্ট দেওয়ার জন্য আইসিবি (ICB) সহ অন্যান্য প্রাতিষ্ঠানিক বিনিয়োগকারীদের সক্রিয় ভূমিকা পালন করতে হবে।
৪. মৌলভিত্তি সম্পন্ন কোম্পানির তালিকাভুক্তি: বাজারে ভালো মানের এবং লাভজনক সরকারি ও বহুজাতিক কোম্পানিকে অন্তর্ভুক্ত করতে হবে যাতে বিনিয়োগকারীরা নিরাপদ বোধ করেন।
বিনিয়োগকারীদের জন্য দিকনির্দেশনা
এই কঠিন সময়ে সাধারণ বিনিয়োগকারীদের আবেগের বশবর্তী হয়ে সিদ্ধান্ত নেওয়া ঠিক হবে না। পুঁজিবাজারে বিনিয়োগকারীদের আস্থা সংকট চলাকালীন প্যানিক সেল (Panic Sale) বা আতঙ্কে শেয়ার বিক্রি করা লোকসানের অন্যতম কারণ। ধৈর্য ধরে ভালো ডিভিডেন্ড দেওয়া কোম্পানিগুলোতে অবস্থান করা এবং নিয়মিত বাজার পর্যবেক্ষণ করা উচিত। শেয়ারবাজারে বিনিয়োগ সবসময়ই ঝুঁকির, তবে সঠিক তথ্য এবং বিশ্লেষণ থাকলে এই ঝুঁকি কমিয়ে আনা সম্ভব।
আগামীর প্রত্যাশা
পুঁজিবাজারের এই প্রতিকূল অবস্থা চিরস্থায়ী নয়। অতীতেও বাজার বড় ধরণের পতনের পর আবার ঘুরে দাঁড়িয়েছে। তবে বর্তমানের পুঁজিবাজারে বিনিয়োগকারীদের আস্থা সংকট কাটাতে সরকার, বিএসইসি এবং স্টক এক্সচেঞ্জ কর্তৃপক্ষকে সমন্বিতভাবে কাজ করতে হবে। বিনিয়োগকারীরা কেবল তখনই বাজারে ফিরবেন যখন তারা তাদের বিনিয়োগের নিরাপত্তা এবং ন্যায্য মুনাফার নিশ্চয়তা পাবেন। বিমা খাতের এই কুপোকাত অবস্থা বা আর্থিক খাতের মন্দাভাব কাটিয়ে বাজার আবার প্রাণবন্ত হয়ে উঠুক— এটাই এখন সাধারণ বিনিয়োগকারীদের প্রধান দাবি। বাজারের গতিশীলতা ফিরে এলে দেশের অর্থনীতি আরও শক্তিশালী হবে এবং সাধারণ মানুষের আস্থার প্রতিফলন ঘটবে সূচকের সবুজ সংকেতে।
Comments
Post a Comment