 |
| বিচ্ছেদের গুঞ্জন নিয়ে অবশেষে মুখ খুললেন তাহসান |
"আমি শান্তি চাই"—এক বুক হাহাকার আর মানসিক ক্লান্তি নিয়ে এই আকুতিই ঝরল দেশের জনপ্রিয় সংগীতশিল্পী ও অভিনেতা তাহসান খানের কণ্ঠে। যার সুরের মূর্ছনায় কোটি ভক্তের হৃদয় শান্ত হয়, সেই প্রিয় শিল্পী আজ নিজের জীবনের ঝঞ্ঝাবিক্ষুব্ধ সময়ে দাঁড়িয়ে করজোড়ে বলছেন, “আমাকে একটু শান্তিতে থাকতে দিন।” গত কয়েক দিন ধরে বিনোদন জগতের সবচেয়ে আলোচিত ও বিতর্কিত বিষয় হয়ে দাঁড়িয়েছে তাহসান ও তার দ্বিতীয় স্ত্রী রোজা আহমেদের বিচ্ছেদের খবর। পর্দার পেছনের এই বিষাদময় গল্পটি যখন প্রকাশ্যে এল, তখন থেকেই তাহসান বারবার একটি কথাই বলছেন, "আমি শান্তি চাই"।
বিচ্ছেদের গুঞ্জন ও তাহসানের স্বীকারোক্তি
গত বছরের শুরুতে যখন তাহসান খান তার দ্বিতীয় বিয়ের ঘোষণা দেন, তখন ভক্তদের মাঝে এক মিশ্র প্রতিক্রিয়া দেখা গিয়েছিল। মেকআপ আর্টিস্ট রোজা আহমেদের সঙ্গে নতুন সংসার শুরু করার পর সবাই আশা করেছিলেন, এবার হয়তো থিতু হবেন এই তারকা। কিন্তু সেই আশা খুব দ্রুতই ফিকে হয়ে যায়। বিয়ের এক বছর পূর্ণ হওয়ার আগেই সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম ও সংবাদমাধ্যমে তাদের বিচ্ছেদের খবর চাউর হয়। সম্প্রতি একটি জাতীয় দৈনিকের সাথে আলাপকালে তাহসান নিজেই এই গুঞ্জনের সত্যতা নিশ্চিত করেন। তিনি স্পষ্ট ভাষায় বলেন, "যে খবরটি ছড়িয়েছে, তা সত্য। আমরা আর একসঙ্গে থাকছি না। বেশ কয়েক মাস ধরেই আমাদের মধ্যে দূরত্ব তৈরি হয়েছে এবং আমরা আলাদা থাকছি। খুব শীঘ্রই আনুষ্ঠানিকভাবে এই বিষয়ে বিস্তারিত ঘোষণা দেওয়া হবে।" বিচ্ছেদের এই কঠিন সময়ে মিডিয়া ও ভক্তদের ক্রমাগত কৌতূহলের চাপে অতিষ্ঠ হয়ে তাহসান বারবার বলছেন, "আমি শান্তি চাই"।
কে এই রোজা আহমেদ?
তাহসানের দ্বিতীয় স্ত্রী রোজা আহমেদ পেশায় একজন অত্যন্ত সফল মেকআপ আর্টিস্ট। তাদের পরিচয় হয়েছিল বিয়ের মাত্র চার মাস আগে। ২০২৫ সালের ৪ জানুয়ারি তারা ঘরোয়াভাবে বিবাহবন্ধনে আবদ্ধ হন। রোজা গত এক দশকেরও বেশি সময় ধরে বাংলাদেশ ও যুক্তরাষ্ট্রে ব্রাইডাল মেকআপের কাজ করছেন। নিউইয়র্কে তার নিজস্ব একটি মেকআপ প্রতিষ্ঠানও রয়েছে। পেশাগত জীবনে রোজা যথেষ্ট সফল হলেও ব্যক্তিগত জীবনে তাহসানের সঙ্গে তার রসায়নটা দীর্ঘস্থায়ী হলো না। গত বছরের জুলাই মাস থেকেই তারা আলাদা থাকতে শুরু করেন। এই বিচ্ছেদের খবরটি যখন ভক্তদের মাঝে পৌঁছায়, তখন চারদিকে নানা আলোচনার ঝড় ওঠে। সাধারণ মানুষের এই অতিরিক্ত কৌতূহল থেকে নিজেকে আড়াল করতে চেয়ে তাহসান বলেন, “ব্যক্তিগত বিষয় নিয়ে কথা বলতে ভালো লাগছে না, এই মুহূর্তে আমি শান্তি চাই।”
সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমের চাপ ও মানসিক ট্রমা
তাহসান খান বরাবরই পর্দার বাইরের জীবন নিয়ে কিছুটা অন্তর্মুখী। গত দুই বছর ধরে তিনি সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে খুব একটা সক্রিয় ছিলেন না। ফেসবুক থেকে তার এই দূরে সরে যাওয়ার পেছনে ছিল এক গভীর যন্ত্রণা। তিনি জানিয়েছিলেন, ফেসবুকে ছড়ানো নানা গুজব আর মিথ্যা খবর তাকে মানসিকভাবে বিপর্যস্ত করে তোলে। একবার হাসপাতালে যাওয়ার পর তাকে মানুষ অভিনন্দন জানাতে শুরু করে যে তিনি নাকি বাবা হয়েছেন! এ ধরনের ভিত্তিহীন খবরে বিরক্ত হয়েই তিনি গত বছর ফেসবুক পুরোপুরি ছেড়ে দেন। তখন তার মৌন বার্তা ছিল—"আমি শান্তি চাই"। কিন্তু বিচ্ছেদের খবরটি আসার পর সেই ট্রমা যেন আরও প্রকট হয়ে দেখা দিয়েছে। ভক্ত, শুভাকাঙ্ক্ষী ও গণমাধ্যমকর্মীদের ক্রমাগত ফোনকল আর মেসেজে তিনি এখন দিশেহারা। নিজের অসহায়ত্ব প্রকাশ করে তিনি বলেন, "প্রচুর সংবাদ হচ্ছে, প্রচুর ফোন আসছে—আমি আসলে একটু শান্তি চাই। আমাকে একটু বাঁচতে সাহায্য করুন।"
ফেসবুক ত্যাগের পেছনে আসল কারণ
অনেকেই মনে করেন তারকারা প্রচার পছন্দ করেন। কিন্তু তাহসানের ক্ষেত্রে বিষয়টি ভিন্ন। তিনি মনে করেন, সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম এখন কেবল গুজবের কারখানায় পরিণত হয়েছে। তিনি বলেছিলেন, "দীর্ঘদিন তো ফেসবুক ব্যবহার করলাম। এটা এমন কিছু না যে ব্যবহার করতেই হবে। এখন মনে হচ্ছে, এটা হয়তো আমার জন্য ভালো কিছু না। বিভিন্ন সময় আমাদের নিয়ে নানা গুজব ছড়ানো হয়, যা মানসিক ট্রমার কারণ হয়ে দাঁড়ায়।" নিজের সুস্থতা আর মানসিক স্থিতিশীলতার জন্য তিনি যখন বারবার বলেন, "আমি শান্তি চাই", তখন তার পেছনে এই দীর্ঘদিনের পুঞ্জীভূত বিরক্তি কাজ করে। ভার্চুয়াল জগতের এই নেতিবাচকতা থেকে মুক্তি পেতেই তিনি নিভৃতে থাকতে চেয়েছিলেন, কিন্তু বিচ্ছেদের খবরে তাকে আবারও স্পটলাইটে নিয়ে এসেছে।
অতীতের স্মৃতি ও ক্যারিয়ারের সাফল্য
তাহসানের ব্যক্তিগত জীবন নিয়ে সাধারণ মানুষের আগ্রহের মূলে রয়েছে তার বর্ণাঢ্য ক্যারিয়ার এবং অতীত। ২০০৬ সালে জনপ্রিয় অভিনেত্রী ও গায়িকা রাফিয়াথ রশিদ মিথিলার সঙ্গে তার বিয়ে ছিল দেশের শোবিজ জগতের অন্যতম রোমান্টিক জুটি। ২০১৭ সালে তাদের দীর্ঘ ১১ বছরের দাম্পত্য জীবনের অবসান ঘটে। তাদের একমাত্র কন্যা আইরা তাহরিম খান এখন বড় হচ্ছে। মিথিলার সাথে বিচ্ছেদের পর দীর্ঘ বিরতি দিয়ে রোজা আহমেদকে বিয়ে করেছিলেন তাহসান। কিন্তু দ্বিতীয়বারও ভাগ্যের চাকা যেন উল্টো দিকে ঘুরল। ব্যক্তিগত জীবনের এই টানাপোড়েনের মাঝেও তাহসান তার ক্যারিয়ারে এক চুলও ছাড় দেননি। সংগীতশিল্পী হিসেবে ব্ল্যাক ব্যান্ডের সেই দিনগুলো থেকে আজ পর্যন্ত তিনি জনপ্রিয়তার তুঙ্গে। নাটকে তার উপস্থিতি মানেই কোটি ভিউ আর মুগ্ধতা। বড় পর্দায় শ্রাবন্তীর সাথে তার রসায়নও দর্শকরা সাদরে গ্রহণ করেছিল। অথচ এই আকাশচুম্বী সাফল্যের চূড়ায় দাঁড়িয়েও ব্যক্তি মানুষটি আজ কাতর হয়ে বলছেন, "আমি শান্তি চাই"।
সংবাদমাধ্যমের প্রতি আকুতি ও জনগণের প্রতিক্রিয়া
বিচ্ছেদের খবরটি নিশ্চিত করার পর থেকে তাহসান নিজেকে কিছুটা আড়াল করে রেখেছেন। তিনি জানিয়েছেন, ফোনকলের চাপে তিনি অতিষ্ঠ। সংবাদমাধ্যমের কাছে তার বিনীত অনুরোধ, এই কঠিন সময়ে তাকে যেন একটু স্পেস দেওয়া হয়। একজন সৃজনশীল মানুষের জন্য মানসিক প্রশান্তি অত্যন্ত জরুরি। তাহসান যখন বলেন, "আমি শান্তি চাই", তখন সেটি কেবল তার একার আর্তি নয়, বরং প্রতিটি পাবলিক ফিগারের ব্যক্তিগত গোপনীয়তার অধিকারের লড়াই। সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে তার ভক্তদের একাংশ যখন "দ্বিতীয় বিয়েও কেন টিকল না" বলে বিচারকের আসনে বসছেন, অন্য অংশটি তখন তার এই ভেঙে পড়া মানসিক অবস্থায় সহমর্মিতা প্রকাশ করছেন। ভক্তদের বুঝতে হবে, শিল্পীর পর্দার বাইরের জীবনটাও একান্তই তার নিজস্ব। সেই ব্যক্তিগত জীবনে যখন ঝড় বয়, তখন তার সুরগুলোও বেদনায় নীল হয়ে ওঠে। আর সেই নীল বেদনা থেকেই ধ্বনিত হয়—"আমি শান্তি চাই"।
তারকা জীবনের অন্ধকার দিক
গ্ল্যামার জগতের বাইরের জৌলুস দেখে আমরা প্রায়ই বিভ্রান্ত হই। আমরা ভাবি, যাদের এত নাম-ডাক, অর্থ-প্রতিপত্তি, তাদের হয়তো দুঃখ নেই। কিন্তু তাহসান খানের এই পরিস্থিতি আমাদের চোখে আঙুল দিয়ে দেখিয়ে দেয় যে, তারকারাও রক্ত-মাংসের মানুষ। তাদেরও মন ভাঙে, তারাও ক্লান্ত হন। নিজের একান্ত ব্যক্তিগত যন্ত্রণার কথা যখন জনসমক্ষে কাটাছেঁড়া হয়, তখন সেই পরিস্থিতির ভয়াবহতা সহ্য করা কঠিন। তাহসান এখন সেই কঠিন পথটিই পার করছেন। তার ভাষায়, “প্রচুর সংবাদ হচ্ছে, মানুষ আমাকে নিয়ে নানা কথা লিখছে, কিন্তু দিনশেষে আমি শান্তি চাই। আমাকে দয়া করে একটু শান্তিতে থাকতে দিন।”
ভবিষ্যতের পথে তাহসান
বিচ্ছেদের এই আনুষ্ঠানিক ঘোষণা আসার পর তাহসান হয়তো আরও কিছুদিন নিভৃতে থাকবেন। তিনি কাজ থেকে সাময়িক বিরতি নিতে পারেন কিংবা সুরের মাঝেই খুঁজতে পারেন তার কাঙ্ক্ষিত মুক্তি। তবে ভক্তদের মনে রাখা উচিত, তাহসান মানেই প্রশান্তির সুর। সেই সুরের স্রষ্টা আজ নিজেই যখন বলছেন, "আমি শান্তি চাই", তখন তাকে সেই সুযোগটুকু করে দেওয়া আমাদের দায়িত্ব। তার কাজ দিয়ে তিনি আমাদের বছরের পর বছর বিনোদন দিয়েছেন, বিনিময়ে আজ তার এই চরম বিপর্যয়ের দিনে আমরা যেন তার প্রতি সংবেদনশীল হই।
শেষ কথা: শিল্পী যখন মানুষের কাছে ঋণী
সবশেষে এটুকু বলা যায়, তাহসান খান কোনো বিতর্কের কেন্দ্রবিন্দু হতে চাননি। তিনি চেয়েছেন নিজের গান আর অভিনয় দিয়ে মানুষের হৃদয়ে বেঁচে থাকতে। রোজা আহমেদের সঙ্গে তার পথচলা কেন সংক্ষিপ্ত হলো, তা তাদের ব্যক্তিগত সিদ্ধান্ত। কিন্তু এই সিদ্ধান্তকে কেন্দ্র করে যে শোরগোল শুরু হয়েছে, তা তাকে মানসিক ট্রমায় ফেলে দিয়েছে। নিজের জীবন নিয়ে ক্লান্ত এই শিল্পী তাই বারবার বলছেন, "আমি শান্তি চাই"। আসুন, আমরা একজন গুণী শিল্পীকে বিচারের কাঠগড়ায় না দাঁড় করিয়ে তাকে তার মতো করে বাঁচতে দিই। প্রিয় শিল্পীর জীবনের এই মেঘ কেটে যাক, আবারও তিনি ফিরে আসুন সুরেলা কণ্ঠে, সেই কামনাই করি। কারণ, দিনশেষে শিল্পী ও সাধারণ মানুষ—সবারই শেষ আশ্রয়স্থল হলো মানসিক প্রশান্তি। আর সেই প্রশান্তির খোঁজে আজ তাহসান খানের একটাই প্রার্থনা—"আমি শান্তি চাই"।
Comments
Post a Comment