![]() |
| ওয়ালটন ওয়ালপ্যাড এইট-জি প্রো: সাশ্রয়ী বাজেটে শক্তিশালী পারফরম্যান্স ও ৪জি কলিং সুবিধা। |
Walton Walpad 8G Pro Review: ১৬,৫০০ টাকায় সেরা গেমিং ও কলিং ট্যাব? জানুন বিস্তারিত!
আসসালামু আলাইকুম বন্ধুরা! কেমন আছেন সবাই? একটা প্রশ্ন করি... ধরুন, আপনার বাজেট সাড়ে ষোলো হাজার টাকা। এই টাকায় এমন একটা ট্যাব পাওয়া যাবে, যেটায় সিম বসিয়ে সরাসরি কল করা যায়, স্ক্রিন নব্বই হার্টজ, ব্যাটারি ছয় হাজার মিলিঅ্যাম্পিয়ার, আবার ফ্রি ফায়ারও চলে? আমিও ভেবেছিলাম, নিশ্চয়ই কোথাও ঝামেলা আছে! তাই আজ আমি একটা ঝামেলার খাতা নিয়ে বসেছি। প্রতিটা খুঁত ওই খাতায় টুকে রাখব, আর শেষে দেখব, পাল্লা কোনদিকে ঝুঁকে! আজকের ইনভেস্টিগেটিভ রিভিউতে আমাদের মূল আকর্ষণ—ওয়ালটন ওয়ালপ্যাড এইট-জি প্রো (Walton Walpad 8G Pro)।
বাংলাদেশের বাজারে সাশ্রয়ী মূল্যে ভালো স্পেসিফিকেশন দেওয়া ওয়ালটনের একটি পুরনো অভ্যাস। তবে ট্যাবলেটের বাজারে প্রতিযোগিতা সবসময়ই একটু অন্যরকম। স্যামসাং বা শাওমি যখন ২০-৩০ হাজার টাকার নিচে ভালো ট্যাব দিতে হিমশিম খাচ্ছে, সেখানে ওয়ালটন ১৬,৫০০ টাকায় যা অফার করছে, তা অবিশ্বাস্য মনে হতে পারে। কিন্তু একজন স্মার্ট গ্রাহক হিসেবে আমাদের উচিত কেবল কাগজের স্পেসিফিকেশন না দেখে বাস্তব অভিজ্ঞতা পরখ করা। আজকের এই বিশাল প্রতিবেদনে আমরা এই ট্যাবের প্রতিটি পরত খুলে দেখব।
আনবক্সিং ও দামের ব্যবচ্ছেদ: বক্সে যা যা থাকছে
প্রথমে দামটা পরিষ্কার করে নেওয়া যাক। ওয়ালটন এই ট্যাবটি দুটি ভ্যারিয়েন্টে বাজারে এনেছে। ৪ জিবি র্যাম ও ১২৮ জিবি স্টোরেজের দাম রাখা হয়েছে ১৬,৫০০ টাকা। অন্যদিকে ৮ জিবি র্যাম ও ১২৮ জিবি স্টোরেজের দাম ২০,৫০০ টাকা। দুটি ভ্যারিয়েন্টেই স্টোরেজ একই থাকলেও র্যামের পার্থক্যের কারণে ৪ হাজার টাকার ব্যবধান রাখা হয়েছে। তবে মজার বিষয় হলো, উভয় ক্ষেত্রেই আপনারা পাচ্ছেন এক বছরের অফিশিয়াল ওয়ারেন্টি।
বক্স খুললে প্রথমেই আপনি অবাক হবেন ওয়ালটনের উদারতা দেখে। বক্সে ডিভাইসের সাথে পাচ্ছেন একটি প্রিমিয়াম কোয়ালিটির ফ্লিপ কভার। এই কভারটি কেবল সুরক্ষাই দেয় না, বরং ট্যাবলেটটিকে স্ট্যান্ড হিসেবে ব্যবহার করে ভিডিও দেখা বা টাইপ করার সুবিধাও দেয়। আলাদাভাবে কভার কেনার জন্য আপনাকে এক টাকাও খরচ করতে হচ্ছে না। এছাড়া বক্সে থাকছে ১৮ ওয়াটের ফাস্ট চার্জার, টাইপ-সি ক্যাবল, ইউজার ম্যানুয়াল, সিম ইজেক্টর পিন এবং ওয়ারেন্টি কার্ড। ১৬ হাজার টাকার বাজেটে প্যাকেজিংটি বেশ পরিপাটি।
ডিজাইন ও বিল্ড কোয়ালিটি: মেটালের ছোঁয়া বনাম আঙুলের ছাপ
ওয়ালপ্যাড এইট-জি প্রো-এর ডিজাইনে প্রিমিয়াম ফিল দেওয়ার সর্বোচ্চ চেষ্টা করা হয়েছে। এর পেছনের অংশটি মেটালের তৈরি, যার রঙ 'গান মেটাল'। বডিতে একটি সূক্ষ্ম হেয়ারলাইন প্যাটার্ন আছে যা হাতে নিলে বেশ রাজকীয় অনুভূতি দেয়। মেটাল বডি হওয়ার কারণে ডিভাইসটি বেশ শক্তপোক্ত এবং টেকসই মনে হয়। যারা একটু রাফ ইউজ করেন, তাদের জন্য এটি প্লাস্টিক বডির ট্যাবের চেয়ে অনেক ভালো অপশন।
ঝামেলার খাতায় প্রথম এন্ট্রি: মেটাল বডি হওয়ায় এটি প্রিমিয়াম হলেও এতে আঙুলের ছাপ বা ফিঙ্গারপ্রিন্ট স্মাজ খুব সহজেই পড়ে যায়। অবাক করা বিষয় হলো, ডিভাইসে বায়োমেট্রিক ফিঙ্গারপ্রিন্ট সেন্সর নেই, কিন্তু বডিতে আঙুলের ছাপ ঠিকই পড়ে! এছাড়া সামনে বেজেলগুলো বর্তমান সময়ের হিসেবে একটু বেশিই চওড়া মনে হতে পারে।
ডিসপ্লে অভিজ্ঞতা: ৯০ হার্টজের মসৃণতা ও রেজোলিউশনের সীমাবদ্ধতা
এই ট্যাবে ব্যবহার করা হয়েছে ৮.৬৮ ইঞ্চির একটি আইপিএস ডিসপ্লে। রেজোলিউশন হলো ৮০০ বাই ১৩৪০ পিক্সেল, যাকে আমরা টেকনিক্যালি এইচডি প্লাস বলতে পারি। এই ডিসপ্লের সবচেয়ে বড় শক্তির জায়গা হলো এর ৯০ হার্টজ রিফ্রেশ রেট। সাধারণত এই বাজেটের ট্যাবে ৬০ হার্টজের বেশি দেখা যায় না। ৯০ হার্টজ হওয়ার কারণে স্ক্রল করা, মেনু নেভিগেশন এবং সোশ্যাল মিডিয়া ব্রাউজিংয়ের অভিজ্ঞতা অত্যন্ত মসৃণ।
ব্রাইটনেসের কথা বললে, এটি প্রায় ৩০০ থেকে ৩৫০ নিটস পর্যন্ত উজ্জ্বলতা দিতে পারে। ঘরের ভেতরে ভিডিও স্ট্রিমিং বা পড়াশোনার জন্য এটি যথেষ্ট। কিন্তু সরাসরি সূর্যের আলোতে এটি ব্যবহার করা কিছুটা চ্যালেঞ্জিং হতে পারে। বড় স্ক্রিনে মুভি দেখার আনন্দ থাকলেও একটি বিষয় আপনাকে মাথায় রাখতে হবে।
ঝামেলার খাতায় দ্বিতীয় এন্ট্রি: ৮.৬৮ ইঞ্চির মতো বড় ডিসপ্লেতে কেবল এইচডি প্লাস রেজোলিউশন হওয়ার কারণে শার্পনেসের কিছুটা অভাব লক্ষ্য করা যায়। পিক্সেল ডেনসিটি কম হওয়ায় টেক্সট বা ছবি খুব বেশি ক্রিস্পি মনে হয় না। যারা হাই-ডেফিনিশন কন্টেন্ট দেখতে অভ্যস্ত, তাদের কাছে এটি একটু চোখে লাগতে পারে।
পারফরম্যান্স: হেলিও জি৯৯-এর শক্তি
এখন আসি সবচেয়ে চমকপ্রদ অংশে। এই ট্যাবের ভেতরে ইঞ্জিন হিসেবে কাজ করছে মিডিয়াটেক হেলিও জি-৯৯ (MediaTek Helio G99) চিপসেট। এটি একটি ৬ ন্যানোমিটার আর্কিটেকচারের অত্যন্ত দক্ষ প্রসেসর। এতে রয়েছে দুটি শক্তিশালী কর্টেক্স এ-৭৬ কোর যা ২.২ গিগাহার্টজে চলে এবং ছয়টি সাশ্রয়ী কর্টেক্স এ-৫৫ কোর। গ্রাফিক্সের জন্য আছে মালি জি-৫৭ জিপিইউ।
১৬-২০ হাজার টাকার অনেক স্মার্টফোনেও আজকাল এই চিপসেট দিতে কার্পণ্য করা হয়, সেখানে ওয়ালটন এটি একটি ট্যাবলেটে দিয়েছে। এর পারফরম্যান্স দৈনন্দিন কাজে চমৎকার। ফেসবুকিং, ইউটিউব স্ট্রিমিং বা জুম মিটিংয়ে আপনি কোনো ল্যাগ পাবেন না। গেমিংয়ের ক্ষেত্রেও এটি হতাশ করে না। ফ্রি ফায়ার খেলা যায় অনায়াসে, এমনকি পাবজিও খেলা যায় মাঝারি সেটিংসে। তবে দীর্ঘক্ষণ হেভি গেমিং করলে কিছুটা ফ্রেম ড্রপ হতে পারে, যা স্বাভাবিক।
সফটওয়্যার হিসেবে এতে সরাসরি 'অ্যান্ড্রয়েড সিক্সটিন' (Android 16) এর কথা বলা হয়েছে, যা ব্যবহারকারীদের আধুনিক সফটওয়্যার ফিচারের নিশ্চয়তা দেয়। ইউজার ইন্টারফেসটি অনেকটা ক্লিন রাখা হয়েছে, যাতে প্রসেসরের ওপর চাপ কম পড়ে।
বিস্তারিত টেকনিক্যাল স্পেসিফিকেশন টেবিল
র্যামের অংক: ৪ জিবি নাকি ৮ জিবি?
এই ট্যাবের র্যাম অপশন নিয়ে একটু বিশ্লেষণ করা দরকার। ৪ জিবি র্যামের দাম ১৬,৫০০ টাকা আর ৮ জিবির দাম ২০,৫০০ টাকা। র্যাম দ্বিগুণ করার জন্য অতিরিক্ত ৪,০০০ টাকা খরচ করা কি যৌক্তিক? আমার মতে, যারা মূলত শিক্ষার্থীদের অনলাইন ক্লাস, সাধারণ ব্রাউজিং বা মাল্টিমিডিয়া ব্যবহারের জন্য কিনবেন, তাদের জন্য ৪ জিবি ভ্যারিয়েন্টই সেরা ভ্যালু ফর মানি। কারণ প্রসেসর এবং বাকি সব ফিচার একই থাকছে। তবে যারা একসাথে অনেকগুলো ভারী অ্যাপ চালান বা ভবিষ্যতের কথা ভেবে একটু বেশি মেমোরি চান, তারা ৮ জিবি বেছে নিতে পারেন।
স্টোরেজ নিয়ে চিন্তা নেই, ১২৮ জিবি এমনিতেই অনেক বড় জায়গা। এছাড়া এতে হাইব্রিড সিম স্লট আছে, যার মানে আপনি চাইলে একটি সিম ব্যবহার করে অন্য স্লটে একটি মাইক্রো এসডি কার্ড লাগিয়ে মেমোরি আরও বাড়িয়ে নিতে পারবেন।
ক্যামেরা ও অডিও: ইউটিলিটি নাকি শৌখিনতা?
ট্যাবলেট দিয়ে সাধারণত কেউ শৌখিন ফটোগ্রাফি করে না। ওয়ালপ্যাড এইট-জি প্রো-তে পেছনে দেওয়া হয়েছে ১৩ মেগাপিক্সেলের ক্যামেরা এবং সামনে ৮ মেগাপিক্সেল। পেছনের ক্যামেরায় অটোফোকাস ও ফ্ল্যাশ থাকলেও ছবির কোয়ালিটি গড়পড়তা। এটি মূলত আপনার ডকুমেন্ট স্ক্যান করা বা হঠাৎ কোনো প্রমাণের ছবি তোলার জন্য উপযুক্ত। ৮ মেগাপিক্সেলের ফ্রন্ট ক্যামেরাটি জুম মিটিং বা ভিডিও কলের জন্য বেশ ভালো। ফেস আনলক ফিচারটিও এর মাধ্যমেই কাজ করে।
অডিও অভিজ্ঞতা: ট্যাবে সাধারণত আমরা ভালো সাউন্ড আশা করি। যদিও এখানে ডুয়াল স্পিকারের মতো গ্রিল দেখা যায়, কিন্তু বাস্তব অভিজ্ঞতা একটি সাধারণ বটম-ফায়ারিং স্পিকারের মতো। সাউন্ড লাউডনেস মোটামুটি, তবে স্টেরিও সেপারেশন বা বেস খুব একটা পাওয়া যায় না। এটি আমার ঝামেলার খাতায় আরও একটি ছোট্ট এন্ট্রি।
ব্যাটারি ও কানেক্টিভিটি: আসল গেম চেঞ্জার
এই ট্যাবের ৬০০০ মিলিঅ্যাম্পিয়ারের ব্যাটারি আপনাকে সারাদিনের মাঝারি ব্যবহারে ব্যাকআপ দেবে। হেলিও জি-৯৯ এর পাওয়ার এফিসিয়েন্সি এখানে দারুণ কাজে লাগে। সাথে ১৮ ওয়াটের ফাস্ট চার্জার কিছুটা স্বস্তি দিলেও, এত বড় ব্যাটারি ফুল চার্জ করতে প্রায় আড়াই থেকে তিন ঘণ্টা সময় লাগতে পারে। যদি ব্যাটারিটা ৮০০০ মিলিঅ্যাম্পিয়ার হতো, তবে এটি অপ্রতিদ্বন্দ্বী হতো।
তবে এই ট্যাবের সবচেয়ে বড় সেলিং পয়েন্ট হলো এর ৪জি কলিং ফিচার। অনেক ট্যাবে কেবল ওয়াইফাই থাকে, কিন্তু এখানে আপনি সরাসরি সিম বসিয়ে কল করতে পারবেন এবং মোবাইল ডেটা ব্যবহার করতে পারবেন। এটি আপনাকে স্মার্টফোনের বিকল্প হিসেবে ব্যবহারের সুযোগ দেয়। গ্রাম বা শহরের এমন জায়গায় যেখানে ভালো ওয়াইফাই নেই, সেখানে এটি লাইফসেভার হিসেবে কাজ করবে।
ভালো ও মন্দ দিক (Pros & Cons)
- ভালো দিক ১: হেলিও জি৯৯ প্রসেসরের কারণে দুর্দান্ত গতি।
- ভালো দিক ২: সরাসরি ৪জি সিম ব্যবহারের সুবিধা।
- ভালো দিক ৩: ৯০ হার্টজ রিফ্রেশ রেট সম্পন্ন ডিসপ্লে।
- ভালো দিক ৪: বক্সেই প্রিমিয়াম মেটাল ফিনিশ ও ফ্লিপ কভার।
- মন্দ দিক ১: ডিসপ্লে রেজোলিউশন মাত্র এইচডি প্লাস।
- মন্দ দিক ২: কোনো ডেডিকেটেড ফিঙ্গারপ্রিন্ট সেন্সর নেই।
- মন্দ দিক ৩: ব্যাটারি চার্জিং বেশ ধীরগতির।
সচরাচর জিজ্ঞাসিত প্রশ্নাবলী (FAQ)
প্রশ্ন ১: এই ট্যাবে কি পাবজি বা ফ্রি ফায়ার ভালো খেলা যায়?
উত্তর: হ্যাঁ, হেলিও জি৯৯ প্রসেসর থাকায় ফ্রি ফায়ার খুব ভালো চলে। পাবজি মাঝারি সেটিংসে স্মুথলি খেলা সম্ভব, তবে আল্ট্রা গ্রাফিক্সে হালকা ফ্রেম ড্রপ হতে পারে।
প্রশ্ন ২: এটা কি পড়াশোনা বা অনলাইন ক্লাসের জন্য ভালো?
উত্তর: অবশ্যই! ৮.৬৮ ইঞ্চির স্ক্রিন পিডিএফ পড়ার জন্য বা জুম মিটিং করার জন্য চমৎকার। সাথে সিম সাপোর্ট থাকায় ওয়াইফাই ছাড়াই ইন্টারনেটে যুক্ত থাকা যায়।
প্রশ্ন ৩: চার জিবি আর আট জিবির মধ্যে কোনটা কিনলে লাভ বেশি?
উত্তর: বাজেটের কথা চিন্তা করলে ৪ জিবি ভ্যারিয়েন্টটি বেশি সাশ্রয়ী। তবে আপনি যদি ভবিষ্যতে অনেক বড় অ্যাপ বা হেভি গেমিং করতে চান, তবে ২০,৫০০ টাকা দিয়ে ৮ জিবি নেওয়া বুদ্ধিমানের কাজ হবে।
এটি কি আপনার কেনা উচিত?
সবশেষে ঝামেলার খাতা আর পয়েন্ট উসুলের পাল্লা মিলালে দেখা যায়, ওয়ালটন ওয়ালপ্যাড এইট-জি প্রো (Walpad 8G Pro) ১৬,৫০০ টাকার ভ্যারিয়েন্টে একটি সত্যিকারের 'পয়সা উসুল' প্রোডাক্ট। এর মেটাল বডি, শক্তিশালী প্রসেসর এবং ৪জি কলিং একে এই প্রাইস রেঞ্জের সেরা ট্যাবে পরিণত করেছে। যদিও ডিসপ্লে শার্পনেস বা ফিঙ্গারপ্রিন্ট সেন্সরের অভাব রয়েছে, তবে মনে রাখতে হবে—এই বাজেটে এর চেয়ে বেশি কিছু আশা করাটাও বোকামি হবে।
Walton Walpad 8G Pro রিভিউ-এর বিস্তারিত ভিডিও দেখুন-
ভিডিও সৌজন্যে: TECH TV BSL
মন্তব্যসমূহ
একটি মন্তব্য পোস্ট করুন